২১ বলেই স্বপ্ন শেষ

Slider খেলা

37286_b3

 

মাত্র ২১ বলেই সব উত্তেজনা মিইয়ে গেল। ২ উইকেট আর ৩৩ রানের সমীকরণ বিশ্ব ক্রিকেটে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল দারুণ। কিন্তু চূড়ায় ওঠা পারদ নামতে সময় লাগলো মিনিট ১৫। আর বল খেলা হলো ৩.৩ ওভার। আর এতেই শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের স্বপ্ন। তিন বলের ব্যবধানে ২ উইকেটের পতন দেখলেন ৬৪ রানে অপরাজিত থাকা সাব্বির। চট্টগ্রাম টেস্টে ব্যাট-বলে শেষ পর্যন্ত নায়ক বেন স্টোকস। প্রথম টেস্টে হারের শঙ্কা উড়িয়ে জয় ছিনিয়ে নিলেন তারা। ২৮৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ম্যাচের পঞ্চম ও শেষ দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩৩ রান।  হাতে অক্ষত ছিল ২ উইকেট। ৯৪ টেস্টে ৮ম ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বপ্ন তখন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। কিন্তু মাত্র ৩ বলের ব্যবধানে বাংলাদেশের হৃদয় ভেঙে দিলেন স্টোকস। ১৬ রান করা তাইজুলের পর শফিউলকে সুযোগই দিলেন না এ ইংলিশ পেসার। বাংলাদেশের ইনিংস থেমে পড়ে ২৬৩ রানে। ননস্ট্রাইক প্রান্তে ৬৪ রানে অপরাজিত থাকা সাব্বির রহমান স্বপ্ন নিভে যেতে দেখলেন অসহায় চোখে। চট্টগ্রাম টেস্টে প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে ১৮ রানে আউট হয়েছিলেন স্টোকস। ২৯৩ রানে আল আউট হওয়া ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তখন লিড নেয়ার স্বপ্ন দেখছিল মুশফিকুর রহীম বাহিনী। ঠিক তখন ৪ উইকেট নিয়ে সেই আশার গুঁড়ে বালি দেন স্টোকস। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬২ রানে ৫ উইকেট হারানো বিধ্বস্ত ইংলিশদের রক্ষা করেন ব্যাট হাতে ৮৫ রান করে। দুই ইনিংসে ১০৩ রান সেই সঙ্গে ৬ উইকেট। ম্যাচে ক্যাচও নিলেন ৩টি। সুপারম্যানের মতো স্টোকসের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে দলের জয়, তাই ম্যাচসেরাতো তিনিই হবেন। মাত্র ২২ রানের ব্যবধানে টেস্টে কখনও হারেনি বাংলাদেশ। তাই এমন সুযোগ হাতছাড়া করে মুশফিক সান্ত্বনা খুঁজেছেন ১৫ মাস পর টেস্ট খেলেও দারুণ লড়াই করার আড়ালে।
৬ বছর আগে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে এই মাঠেই যাত্রা করেছিলেন অ্যালেস্টার কুক। সেই ম্যাচে নায়ক ছিলেন তিনিই। কিন্তু এবার চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ব্যর্থ ইংলিশদের এ সেরা ওপেনার। কিন্তু দলের পারফরম্যান্সে জয় এসেছে। তাই খুশিতো হবেনই। ১৯৮২ সালের পর  এবারই প্রথম  ইংল্যান্ড চার স্পিনার ব্যবহার করেছিল চট্টগ্রাম টেস্টে। কিন্তু সেখানে সবাইকে পেছনে ফেলে ২৫ বছর বয়সী পেসার স্টোকস দেখান চমক। তাই স্টোকসের প্রশংসা করতে ভুলেননি অধিনায়ক অ্যালেস্টার কুকও। অন্যদিকে এই পর্যন্তু ৭২ টেস্ট হেরেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ইনিংস ও রানের ব্যবধানে হার ৩০, উইকেট ব্যবধানে হার ২১ ও রানের ব্যবধানে হারের সংখ্যা ১৫টি। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪৬৫ রান ছিল বড় ব্যবধান। আর ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৭৭ রানে হারের ব্যবধানটি ছিল সবচেয়ে ছোট। তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষ ২২ রানে হারটি টাইগারদের আফসোসের প্রতীক হয়ে রইলো। এ নিয়ে ২২ বার টেস্টে টার্গেট তাড়া করতে নেমেছিল বাংলাদেশ। এর মধ্যে ২০০৯ এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২১৫ ও ২০১২ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১০০ রান তাড়া করে জয় এসেছিল। অবশ্য পরে ব্যাট করে পাঁচবার ড্র করার সাফল্যও দেখিয়েছে বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম টেস্টে টসে জিতে ব্যাটিং বেছে নিয়েছিলেন কুক। কিন্তু ইংলিশ অধিনায়ককে মুদ্রার বিপরীত দিক দেখিয়েছেন বাংলাদেশের অভিষিক্ত স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ। তার অফ স্পিন জাদুতে ভেঙে পড়েছিল ইংলিশ ব্যাটিং লাইনআপ। সঙ্গে দুই বাঁ-হাতি স্পিনার সাকিব আল হাসান ও তাইজুল ইসলামও ছোবল দিচ্ছিলেন ঘূর্ণিতে। সেখান থেকে মঈন আলী ও জনি বেয়ারস্টোর দুটি ফিফটি দলকে উদ্ধার করে। স্কোর বোর্ডে জমা পড়ে ২৯৩ রান। লিড নেয়ার স্বপ্নে ব্যাট হাতে নেমে ২১ রানে ওপেনার ইমরুলকে হারালেও দলের হাল ধরে রাখেন তামিম ইকবাল। ১৬৩ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর হাল ধরেছিলেন অধিনায়ক মুশফিক ও সাকিব আল হাসান। ৫ম উইকেটে তাদের ৫৮ রানের জুটিতে ইংলিশদের টপকাতে দরকার ছিল মাত্র ৭২ রান।  দ্বিতীয় দিন বল শেষ হতে মাত্র ২.৩ ওভার বাকি। সেই সময় ৪৮ রান করা মুশফিককে উইকেটের পেছনে বেয়ারস্টোর ক্যাচ বানিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেন স্টোকস। তৃতীয় দিন সকাল শুরু হয়েছিল হাতে পাঁচ উইকেট নিয়ে। কিন্তু মাত্র ২৭ রান যোগ করতেই সব শেষ। ৩১ রান করা সাকিব পাগলাটে শটে মঈন আলীকে উইকেট উপহার দেন। এরপর লেগ স্পিনার রশিদ ফেরান শফিউলকে। বাকি কাজটা সারেন স্টোকস। অভিষিক্ত মিরাজ, রাব্বি ও সাব্বিরকে আউট করে টাইগারদের লিড নেয়ার স্বপ্নে পেরেক ঠোকেন স্টোকস।
৪৫ রানে এগিয়ে থেকে দারুণ শুরু করেছিলেন কুক ও বেন ডাকেট। কিন্তু এবার টাইগারদের ত্রাতা হয়ে আসেন পরীক্ষিত তারকা সাকিব আল হাসান। ৬২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চোখে অন্ধকারই দেখছিলেন ইংলিশরা। সেখানেও স্টোকস ব্যাট হাতে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালেন। আউট হওয়ার আগে করলেন ১৫১ বলে ৮৫ রান। বেয়ারস্টোকে নিয়ে ১২৭ রানের জুটি গড়ে দলকে ভালো অবস্থানে পৌঁছে দিলেন। শেষ পর্যন্ত দল ২৪০ রানে আল আউট হলেও টাইগারদের সামনে চতুর্থ ইনিংসে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৮৬ রানের। শুরুতেই প্রথম ইনিংসে ৭৮ রান করা তামিম ফিরে গেলেও হাল ধরেন ইমরুল কায়েস। ইমরুল ও মুমিনুলের বিদায়ে ১০৩ রানে ৩ উইকেট হারায় টাইগাররা। এরপর সাকিব ও মাহমুদুল্লাহর বিদায়ে ১৪০ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকে টাইগাররা। সেখান থেকে দারুণভাবে দলকে ম্যাচে ফেরান মুশফিক ও সাব্বির। ৬ষ্ঠ উইকেটে ৮৭ রানের জুটি গড়েন তারা। দলের জয়ের জন্য প্রয়োজন ৫৯ রান তখন ইংলিশ স্পিনার গ্যারেথ ব্যাটির বলে আউট হয়ে শেষ বিকালে ফের আফসোস হলেন ৩৯ করা মুশফিক। এরপর একাই লড়ে গেছেন সাব্বির। এরমধ্যে মিরাজ ও রাব্বিও আউট। তবে লড়াইটা তাইজুলকে নিয়ে জমিয়ে তোলেন সাব্বির। দলের যখন জয়ের জন্য ৩৩ রান দরকার তখন ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশের দর্র্শকদের টেনশনে রেখে শেষ হয়েছিল চতুর্থ দিন।
ভক্তকুলের ১৭ ঘণ্টার দোয়া আর অপেক্ষার পর ১১ রান করা তাইজুল ৫ম দিন নিজের নামের পাশে যোগ করেন আরও ৪টি রান। কিন্তু নিজের দ্বিতীয় ওভারে এসে তাইজুলকে এলবিডাব্লিউর ফাঁদে ফেলেন স্টোকস। অবশ্য রিভিউ নিয়ে আউটের সিদ্ধান্ত পান। তার এক বল পর শফিউলকেও আর কোনো সুযোগ দেননি। তবে ম্যাচের ২৬তম রিভিউ রেকর্ডের পর ইংলিশরা জয়ের উল্লাস ও স্বস্তিতে ভাসেন। সেই সময় ১০২ বলে ৩ চার ২ ছয়ে ৬৪ রান অপরাজিত থাকা সাব্বির অসহায়ের মতো  দেখেছেন অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
২৬  টেস্টে বেন  স্টোকস ৩ সেঞ্চুরি ৭ ফিফটিতে করেছেন ১৫৩২ রান। উইকেট নিয়েছেন ৬৬টি। এর মধ্যে সেরা শিকার ইনিংসে ৩৬ রানে ৬ উইকেট। তবে ব্যাট বল হাতে ৫০ এর উপর রান করেছেন ৭ ম্যাচে। তিন ম্যাচে আছে দুটি সেঞ্চুরি ও একটি ডাবল সেঞ্চুরিও। এরই মধ্যে ৫ উইকেট ২ বার ও ৪ উইকেট নিয়েছেন ৪ বার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *