অচলাবস্থায় সিলেট সিটি করপোরেশন

Slider ফুলজান বিবির বাংলা

37008_b1

 

ঢাকা;  স্থানীয় সংসদ সদস্য হওয়ায় সিলেটের উন্নয়নে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সব সময়ই আলাদা একটা নজর। হিসেবের বাইরেও তাই মাঝে মধ্যেই বিশেষ বরাদ্দ আসে সিলেটের নামে। সিলেট সদর উপজেলা আর সিলেট সিটি করপোরেশন (এসসিসি) নিয়েই গঠিত অর্থমন্ত্রীর সংসদীয় এলাকা। নিজস্ব আয়ে পিছিয়ে থাকায় উপজেলার প্রতিই বেশির ভাগ সময় সদয় দৃষ্টি থাকে অর্থমন্ত্রীর। এবার যখন অর্থমন্ত্রীর বরাদ্দ আসে নিজেদের ভাগে একটু বেশিই চাইলেন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা। তাদের অনুরোধেই অর্থমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দ থেকে ১৬ কোটি টাকার ভাগ পায় সিলেট সিটি করপোরেশন। আর সেই বরাদ্দই ঝড় হয়ে এসেছে সিলেট সিটি করপোরেশনে। কাজের ভাগাভাগি নিয়ে কাউন্সিলরদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে এখন তালা ঝুলছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে।

সূত্র জানিয়েছে, সিটি করপোরেশনের জন্য অর্থমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দ পেতে শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন আজাদুর রহমান আজাদ, এসএম আবজাদ হোসেন, সিকন্দর আলী, তৌফিক বক্স লিপন, রকিবুর রহমান ঝলক, মোস্তাক আহমদসহ কয়েকজন আওয়ামী বলয়ের কাউন্সিলর। তাদের চেষ্টা সফলও হয়। ২০ লাখ টাকার বরাদ্দের ১৬ লাখই ভাগে পড়ে সিটি করপোরেশনের। যেহেতু তারা বরাদ্দটা এনে দিয়েছেন সিটি করপোরেশনকে তাই কথা ছিল বরাদ্দের টাকায় তাদের ওয়ার্ডে উন্নয়নটা একটু বেশিই হবে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো আলাপ ছাড়াই নিজের ইচ্ছেমতো কাজ ভাগ করে দেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব। পরদিন একটি জাতীয় দৈনিকে কাজের টেন্ডার প্রকাশিত হলে তখনই বিষয়টি জানতে পারেন ঐ কাউন্সিলররা। তারা চেষ্টা করেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের। সময় দিচ্ছিলেন না প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব। সোমবার সময় দেন কাউন্সিলরদের তিনি। অপেক্ষা করেও যখন তার দেখা পাননি কাউন্সিলররা তখন তালা ঝুলিয়ে দিলেন এনামুল হাবীবের কক্ষে। অবস্থা যে বেগতিক তা বুঝতে পেরে সটকে পড়েন সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান। পরে তার কক্ষেও তালা ঝুলান কাউন্সিলররা। তারা তালা ঝুলিয়ে দেন হিসাব নিরীক্ষণ কর্মকর্তা, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আ ছ ম মনছুরের কক্ষেও। সেই থেকে তালা ঝুলছে তিন কর্মকর্তার কক্ষে। ঘটনার পরদিন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বৈঠকেও বসলেও সুরাহা হয়নি এখনো।
কাউন্সিলররা ক্ষেপে যাওয়ায় এখন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীবের অনেক কীর্তিই ফাঁস হচ্ছে। ‘মি. ওয়ান পার্সেন্ট’ নামে পরিচিতিও জুটেছে তার। এক ভাগ কমিশন না পেলে কোনো কাজেই ছাড় দেন না তিনি। ‘তালাকাণ্ডে’র পেছনের ঘটনা হিসেবে অন্য যে টেন্ডারের বিষয়টি সামনে এসেছে অভিযোগ সে টেন্ডারটিও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আটকে দিয়েছেন মূলত কমিশন না পেয়েই। লালদীঘির পাড়ে সিটি মার্কেট ভাঙার টেন্ডারটি ১ কোটি পাঁচ লাখ টাকা সর্বোচ্চ দর হেঁকে পেয়েছিলেন ২৬ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি সাহেদ আহমদ। মানবজমিনকে তিনি বলেন, টেন্ডারে বিজয়ী হওয়ার পর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে ‘খোশ’ করতে বলেছিলেন। তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ‘খোশ’ করেননি তাই কার্যাদেশও পাচ্ছেন না। এদিকে টেন্ডারের টাকা জমা দেয়ার জন্য আনা ব্যাংক ঋণের সুদ কেবলই বেড়ে চলেছে বলে জানান সাহেদ আহমদ।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সমানভাবে বণ্টনের কথা থাকলেও ভালো কমিশন সুবিধা পেতেই তিনি তার পছন্দমতো সাজিয়েছেন বিভিন্ন ওয়ার্ডের উন্নয়ন কাজ। কোনো ওয়ার্ডের ভাগে পড়েছে বেশি, কোনোটাতে কম আর কোনোটার ভাগে কিছুই জুটেনি। উন্নয়ন কাজের জন্য ঘোষিত টেন্ডারটি ঘেঁটে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ১ কোটি ২৮ লাখ টাকার বরাদ্দ পেয়েছে ৯ নং ওয়ার্ড, কোটি টাকার উপরে বরাদ্দ পেয়েছে ১৩ ও ২৬ নং ওয়ার্ডও। ১৩ নং ওয়ার্ড পেয়েছে ১ কোটি ১৬ লাখ ও ২৬ নং ওয়ার্ড পেয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ টাকার বরাদ্দ। এছাড়া ৮ ও ১০ নং ওয়ার্ডের জন্য ৮৮ লাখ, ৪ ও ১২ নং ওয়ার্ডের জন্য ৮০ লাখ, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের জন্য ৭২ লাখ, ২০ নং ওয়ার্ডের জন্য ৬০ লাখ, ২৩ নং ওয়ার্ডের জন্য ৩৬ লাখ, ৭ নং ওয়ার্ডের জন্য ২৪ লাখ, ১৫ নং ওয়ার্ডের জন্য ১৬ লাখ, ১৪ নং ওয়ার্ডের জন্য ৮ লাখ টাকার কাজের বরাদ্দ দেয়া আছে টেন্ডারে। ১, ২ ও ৩, ১১, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২১, ২২, ২৪, ২৫ ও ২৭  নং ওয়ার্ডের ভাগে কিছুই পড়েনি।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার এ ‘স্বেচ্ছাচারিতা’য় স্বভাবতই ক্ষেপেছেন কাউন্সিলররা, বিশেষ করে যারা এ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছিলেন সিটি করপোরেশনের জন্য। যেভাবে জল ঘোলা হচ্ছে-এমনকি কপালও পুড়তে পারে এনামুল হাবীবের। একাট্টা হচ্ছেন কাউন্সিলররা এমনকি-অনাস্থাও আনা হতে পারে তার প্রতি। আর তেমনটি হলে সিটি করপোরেশন ছাড়তে হতে পারে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীবকে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯, এ ক্ষমতা দিয়েছে কাউন্সিলরদের। আইনের ৬২ ধারার ৪ নং উপধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘করপোরেশনের বিশেষ সভায় উপস্থিত কাউন্সিলরগণের মোট সংখ্যার তিন-পঞ্চমাংশের ভোটে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের জন্য প্রস্তাব গৃহীত হলে সরকার তাহাকে তাহার পদ হইতে প্রত্যাহার করিবে।’ অর্থাৎ কাউন্সিলররা জোট বাঁধলে বিপদই অপেক্ষা করছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীবের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *