লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাতের ময়দান

Slider সারাবিশ্ব

31392_labbaik

 

ঢাকা: ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিয়ামাতা, লাকা ওয়াল মুল্‌ক, লা শারিকা লাকা।’ অর্থাৎ- হাজির হে আল্লাহ হাজির, আপনার মহান দরবারে হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। সব প্রশংসা, নিয়ামত এবং সব রাজত্ব আপনারই।
হজযাত্রীদের সমস্বরে এ উচ্চারণে প্রকম্পিত হলো পবিত্র, ঐতিহ্যবাহী আরাফাতের ময়দান।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাওয়া হজযাত্রীরা সব ভেদাভেদ ভুলে গতকাল মহান আল্লাহর ডাকে সমবেত হন সেখানে। এই সেই আরাফাতের ময়দান যেখানে দাঁড়িয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি বুকে ধরে হজযাত্রীরা এখানে ইবাদত বন্দেগিতে কাটিয়ে দেন সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এই ময়দানে তারা একসঙ্গে আদায় করেন জোহর ও আসরের নামাজ। তার আগে খুৎবা দেয়া হয় পবিত্র মসজিদে নামিরা থেকে। খুৎবা দেন গ্রান্ড মসজিদের ইমাম শেখ আবদুল রহমান আল-সুদাইস। টানা ৩৫ বছর এই ময়দানে খুৎবা দিয়েছেন গ্রান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল আশেইক। কিন্তু তিনি শারীরিক সমস্যার কারণে এবার খুৎবা দিতে পারেন নি। আরাফাতের ময়দানে সবাই মিলে এক জাতি- মুসলিম। সবাই এক আল্লাহর অতিথি। আরাফাতের ময়দানে সমবেত হওয়া ও সেখানকার ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করাকেই হজের প্রধান অংশ বলা হয়। তাই এ দিনকে হজের দিন বলা হয়। গতকাল দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হজযাত্রীদের অবস্থান করার কথা এই ময়দানে। এর মধ্যে মসজিদে নামিরা থেকে খুৎবা দেয়ার পর হজযাত্রীরা ইমামের পেছনে একসঙ্গে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন। এর আগে শনিবার জোহরের নামাজের আগেই মিনায় পৌঁছেন লাখ লাখ হজযাত্রী। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় পবিত্র হজের ৫ দিনের আনুষ্ঠানিকতা। শনিবার দিবাগত রাত মিনাতেই অবস্থান করেন হজযাত্রীরা। সেখানে গতকালের ফজরসহ মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় শেষে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা ছুটে যান আরাফাতের ময়দানে। মিনা থেকে আরাফাতের ময়দান ১০ কিলোমিটার বা ৬ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। গতকাল মিনায় ফজরের নামাজ আদায় করেই কেউ পায়ে হেঁটে, হুইল চেয়ারে, বাসে করে, যে যেভাবে পারেন সেভাবেই ছুটে যান আরাফাতের ময়দানে। দু’টুকরো সাদা কাপড়ে ঢাকা হজযাত্রীতে যেন আরাফাতের ময়দান ও এর আশপাশ সফেদ রূপ ধারণ করে। গতকাল এখানে মাগরিবের নামাজ আদায় না করেই হজযাত্রীদের রওনা হওয়ার কথা মুজদালিফার দিকে। এবার হজ করছেন প্রায় ২০ লাখ মুসলিম।
আরাফাত দিবসে পবিত্র নামিরা মসজিদ থেকে খুৎবা দেন সালেহ বিন হুমাইদ। তিনি শূরা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এর আগে। এছাড়া তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। ১৯৮১ সাল থেকে মুসলিমদের কাছে হজের দিন বলে পরিচিত আরাফাত দিবসে বয়ান দিয়ে আসছেন গ্রান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল আশেইক। কিন্তু এ বছর শারীরিক সমস্যার জন্য তিনি বয়ান দিতে পারেন নি। স্থানীয় মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, রোববার স্বাস্থ্যগত কারণে আল আশেইক নামিরা মসজিদে খুৎবা দিতে পারবেন না। যদি তিনি রোববার এই খুৎবা দিতে পারতেন তাহলে এটা হতো তার টানা ৩৬তম খুৎবা। পূর্বসূরি শেখ আবদুল আজিজ বিন বাজের মৃত্যুর পর ১৯৯৯ সালে তাকে গ্রান্ড মুফতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরাফাতের ময়দানে যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে তার বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে এতদিন বয়ান, খুৎবা দিয়ে আসছিলেন এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর পণ্ডিত মোহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহাবের বংশধর। এর আগে দেয়া খুৎবা বা বয়ানে তিনি মৌলবাদী জঙ্গিবাদের নিন্দা জানিয়েছিলেন।
এবার হজ করছেন মিশরের হাসান মোহাম্মদ (৬০)। তিনি হজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, এ এক অবর্ণনীয় অনুভূতি। এটা বুঝতে হলে আপনাকে এখানে আসতে হবে। এ নিয়ে আমি ৬ বার হজ করলাম। কিন্তু আমি যখন মক্কায় আসি তখন বুঝাতে পারি না যে, আমি কতটা খুশি হই। মিশরের আরেক হজযাত্রী আশরাফ জালাত (৪৩)। তিনি বলেছেন, এখানে বিশ্বের প্রতিটি দেশে মানুষ আছেন। বিশ্বের সব ভাষায় এখানে কথা বলেন তারা। কিন্তু এই হজে এসে তাদের একটিই পরিচয়। তাহলো তারা মুসলিম। তাদের আর কোনো পরিচয় নেই।
উল্লেখ্য, গত বছর ২৪শে সেপ্টেম্বর মিনায় ঘটে যায় হজের সবচেয়ে বিয়োগান্তুক ঘটনা। সেদিন জামারায় শয়তানকে পাথর মারতে গিয়ে পদদলিত হয়ে নিহত হন কমপক্ষে ২২৯৭ হজযাত্রী। এ জন্য এ বছর এক্ষেত্রে সতর্কতা নেয়া হয়েছে আগে থেকেই। জানানো হয়েছে জামারায় শয়তানকে উদ্দেশ্য করে পাথর ছোড়া শুরু হবে আজ সোমবার থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *