সেদিন কালো গাড়ি দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু

Slider গ্রাম বাংলা জাতীয় টপ নিউজ

36721_f2
গ্রাম বাংলা ডেস্ক: ১৯৭৫ সালের ১৪ই আগস্ট। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যায় গণভবন থেকে ৩২ নম্বর বাড়িতে ফিরবেন বঙ্গবন্ধু। সেদিন তাকে নিতে এসেছিল একটি কালো গাড়ি। কালো গাড়ি দেখে অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু গাড়ি দেখে বারবার একটি মন্তব্য করেন, ‘আজকে কালো গাড়ি!’ আমার শোনা ওটাই তার শেষ মন্তব্য। বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন একান্ত সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন শোকাবহ আগস্টের স্মৃতিচারণকালে তিনি  এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকালাম। খুবই বিষণ্ন মন নিয়ে বিদায় নিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফরাসউদ্দিন বলেন, এটা একটা আশ্চর্য বিষয়! সেদিন  যে গাড়িটি তাকে নিতে আসে সেটি কালো রঙের ছিল। গাড়িটি দেখে বঙ্গবন্ধু খুব মন খারাপ করেন।
তিনি জানান, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু কোন দিন কোন গাড়িতে চড়বেন, সেটা তার প্রটোকলের লোকেরাই ঠিক করতো। তিনটি গাড়িতে যাতায়াত করতেন তিনি। তার মধ্যে একটি সাদা ও একটি কালো। বঙ্গবন্ধু যখন গণভবন থেকে চলে যান, তখন আমরা কয়েকজন প্রতিদিনের মতোই তাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গিয়েছিলাম। সেদিন গণভবন থেকে ঘরে ফেরার মুহূর্তে অন্যদিনের মতোই সচিবদের কাছ থেকে বিদায় নিলেও নিভৃতে এক বিষণ্নতার সুরই যেন বেজে উঠেছিল সবার হৃদয়ে। তাই থমকে গিয়েছিলেন শেষ বারের মতো গাড়িতে উঠতে গিয়ে। সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, তিনি জানতেন না, আরেকটি সন্ধ্যা তার জীবনে আসবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কি বুঝতে পেরেছিলেন যে তার সময় ফুরিয়ে আসছে?
জীবনের শেষ দিনটি কি ধরনের কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এমন প্রশ্নের জবাবে ফরাসউদ্দিন জানান, এ শ্রেষ্ঠ বাঙালির জীবনের শেষ বিকালটা অন্যান্য দিনের মতো রুটিন কাজ চললেও দু’টি বিশেষ প্রস্তুতি চলছিল সেদিন গণভবনে। প্রথমটি ছিল পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি। অন্যটি ছিল রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, যুগ্ম সচিব এম মনোয়ারুল ইসলাম এবং রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব শহীদ কর্নেল জামিলউদ্দিন আহমদের বিদায় সংবর্র্ধনায় যোগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু গণভবন থেকে বিদায়ের প্রাক্কালে তার একান্ত সচিব, যুগ্ম সচিব এবং সামরিক সচিবের বিদায় সম্পর্কেও বঙ্গবন্ধু খানিকটা বিষণ্ন ছিলেন বলে জানান ফরাস উদ্দিন। ওই দিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, মনোয়ার আর ফরাস দু’দিন পরেই চলে যাবে; ছেলে দু’টো বড্ড মায়া লাগিয়ে যাচ্ছে। খারাপ লাগবে খুবই। ভাগ্যিস জামিল এখানেই থাকছে।
ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, সন্ধ্যাবেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মো. আবদুল মতিন চৌধুরীর সঙ্গে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি, বক্তৃতার বিষয়বস্তু আলোচনার পাশাপাশি খাবার নিয়েও কথা হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বহিষ্কৃৃত হয়েছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই তাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ল ডিগ্রি দিতে যাচ্ছে, সেটি কতটা সুখকর হবে, সেটি নিয়েও বঙ্গবন্ধুর মনে সংশয় কাজ করেছিল।
রাষ্ট্রপতির বিদায়ী একান্ত সচিব হিসেবে ফরাসউদ্দিন সেদিন বেশির ভাগ সময় বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছিই ছিলেন। তিনি জানান, প্রতিদিন কাজ শেষে গণভবনের সামনের লনে একাকী পায়চারি, গাছদের সঙ্গে কথা বলা, লেকের পানিতে মাছদের সঙ্গে খেলা করা, সবই ছিল বঙ্গবন্ধুর নিয়মিত অভ্যাস। তবে সেদিন সন্ধ্যায় গণভবনের বাইরে দলবল নিয়ে মুক্ত আলোচনার নিত্যকার আসর বসেনি। ওই দিন দুপুরে নোয়াখালীতে ভারতীয় একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় অন্যরা ব্যস্ত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *