নির্বাচনের সংস্কৃতি ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন!

Slider গ্রাম বাংলা টপ নিউজ রাজনীতি

c455e70d37c09f435654d3e92962d9df-02-03-16-ILLUS-AKM-ZAKARIA

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা এবারই প্রথম রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে স্থানীয় সরকারের সবগুলো পর্যায়ের নির্বাচন এর আগে নির্দলীয়ভাবে হলেও এসব নির্বাচনকে কখনো রাজনীতির বাইরে রাখা যায়নি। স্থানীয় সরকারের যেকোনো স্তরের নির্বাচনের পর ফলাফলে কোন দল কতটি পেয়েছে, সেই হিসাব-নিকাশই আমরা গণমাধ্যমে দেখে এসেছি।

গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক পরিচয় ও মনোনয়নে হতে শুরু করেছে। এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন রাজনৈতিক মনোনয়নে প্রথমবারের মতো নির্বাচন—এ বিষয়টিকে ছাপিয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে হাজির হতে যাচ্ছে তা হচ্ছে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুলসংখ্যক ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা। স্থানীয় সরকারের এই স্তরে এ ধরনের নজির আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ঢেউ বা ধারা কি তবে দেশের সব পর্যায়ের নির্বাচনী ব্যবস্থায় পাকা জায়গা করে নিতে যাচ্ছে?
নির্বাচন মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর সঙ্গে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বিষয়টি যায় না। নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচিত হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে যে অবিশ্বাস্যসংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, তাতে বিষয়টি আর ‘ব্যতিক্রম’-এর মধ্যে আটকে থাকেনি। কিন্তু এটা পুরো নির্বাচনটিকেই একটি ‘ব্যতিক্রমী’ নির্বাচনে পরিণত করছে। এমন একটি নির্বাচনের দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক। এবং তা নিরাপদও বটে। ধরে নিচ্ছি, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যত সমালোচনা, এর দায় সবই বিএনপির। সরকারি দলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে পারি, বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার অবস্থান নেওয়ার কারণেই এমন একটি ব্যতিক্রমী নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি ও তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু কৌতূহলের সঙ্গে আমরা দেখছি, সেই ব্যতিক্রমই যেন এখন নিয়ম ও রীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। অথবা এর লক্ষণ দিনে দিনে পরিষ্কার হচ্ছে।
২০১৪ সালের জাতীয় ও ‘রাজনৈতিক’ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের অর্ধেকের বেশি সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক পরিচয়ে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে দেখা গেল যে ২৩৪ জন পৌরসভা চেয়ারম্যানের মধ্যে ৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা সবাই সরকারি দলের প্রার্থী। পৌরসভার এর আগের নির্বাচনটির (২০১১ সালে অনুষ্ঠিত) যেসব তথ্য নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণকারী নাগরিক প্রতিষ্ঠান সুজনের সূত্রে পাওয়া যায়, সেখানে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত বলে কিছুর উল্লেখ দেখা যায়নি। ধরে নিতে পারি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ‘মৃদু’ প্রভাব পড়েছিল পৌরসভা নির্বাচনে।
কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রভাব সম্ভবত ‘মৃদু’ থেকে দিনে দিনে ‘শক্তিশালী’ হতে শুরু করেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ে এখন পর্যন্ত যে আলামত দেখা যাচ্ছে, তাতে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি বেশ পোক্তভাবেই জেঁকে বসেছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ সম্ভবত সে কারণে আগেভাগেই এ নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছেন। ‘ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আমাদের কিছু প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এটা হতেই পারে। বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত সাত বছরে যে উন্নয়ন করেছে, তাতে মানুষের আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।’ আসলেই তো, কিছু প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেই পারেন! ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের উদাহরণ তো আমাদের সামনে রয়েছে। সেই নির্বাচনে যদি অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারেন, তবে ইউপিতে ‘কিছু প্রার্থী’ এভাবে নির্বাচিত হতে সমস্যা কী! তবে ‘উন্নয়ন’-এর সঙ্গে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সম্পর্কটা কোথায়, হানিফের বক্তব্যে তা অবশ্য পরিষ্কার হলো না।
প্রথম দফায় যে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে এরই মধ্যে অন্তত ২৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এঁরা সবাই আওয়ামী লীগের। আরও প্রায় ২৬টি ইউনিয়নেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কারণে এই ইউনিয়নগুলোতে এখন শুধু আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীরা রয়েছেন। যাঁদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তাঁদের আপিল ও আপত্তির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলে থাকবে।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা ছিল গতকাল ২ মার্চ। এই পর্ব শেষ হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে! আগের দুটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন এমন নজির কোথাও উল্লেখ নেই। নির্বাচন কমিশনের কাগজপত্রেও পাওয়া যায়নি, সুজনও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিএনপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে ১১৪টি আসনে দলটির কোনো প্রার্থী নেই। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ২০টিতে নানা কারণে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেনি। তাদের অভিযোগ, বাধা দেওয়ার কারণে ৮৩টি ইউনিয়ন পরিষদে তাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এ অভিযোগ মেনে নেয়নি। কমিশন বলেছে, এ ধরনের অভিযোগের কোনো সত্যতা তারা পায়নি।
আমাদের বেয়াড়া ও কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগে, নির্বাচন কমিশন কি আসলেই এসব অভিযোগের সত্যতা খোঁজার চেষ্টা করেছিল? যে ৮৩ জন বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি, তাঁরা সবাই দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা কাগজ পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ বা বিএনপিতে যেখানে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাওয়াই একটা বড় ঘটনা, সেখানে মনোনয়ন পাওয়ার পরও বিএনপির এতসংখ্যক মনোনয়নপত্র দাখিল করা থেকে বিরত থাকবে, এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? কোনো কারণ ছাড়া কি এমনটি ঘটতে পারে? নির্বাচন কমিশন কি ভেবে দেখেছে যে কী এমন কারণ ঘটল, যাতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েও প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিলেন না? নির্বাচন কমিশন তাদের ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছে, কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক তাতে কী আসে যায়!
বিএনপির আশঙ্কা, যে ধরনের চাপ ও কৌশল সরকারের তরফে অব্যাহত রাখা হয়েছে, তাতে বিএনপির প্রার্থীর সংখ্যা আরও কমতে পারে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানের সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রথম দফা ইউপি নির্বাচনের এই নজির পরের দফাগুলোতে আরও জোরেশোরে পড়ার আশঙ্কাকেই জোরদার করছে। সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের উদ্যোগ–আয়োজন, মনোনয়নপত্র দাখিলসহ নানা কর্মকাণ্ড ঠিক রেখে শেষ পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হওয়ার প্রথাটি দিনে দিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রার্থীদের চাওয়াটিও যেন অনেকটাই এ রকম যে নির্বাচনে অংশ নেবেন ঠিকই, কিন্তু কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকবে না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি না হয়ে যদি নির্বাচিত হওয়া যায়, তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে কে চায়!
প্রথম দফায় যে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে অর্ধেকেরও বেশি আসনে এখনো আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। পত্রপত্রিকার খবর বলছে, ৪১২টি ইউনিয়নে মনোনয়ন পাওয়া আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। এ অবস্থায় ১১৪টি আসনে বিএনপির প্রার্থী না থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা খুব স্বস্তিতে আছেন বলে মনে হয় না। নিজ দলের বিদ্রোহীরা তাঁদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন। ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হওয়ার আশায় ছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত যে প্রার্থীরা, তাঁদের অনেকেরই আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছেন এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বিএনপিকে সামলানো বা কোণঠাসা করার কাজটি আওয়ামী লীগের জন্য যতটা সহজ, নিজ দলের বিদ্রোহীদের জন্য ততটা নয় বলেই তো মনে হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের সবচেয়ে দোরগোড়ার সরকার। এই নির্বাচন নিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সব সময়ই উৎসাহ ও উদ্দীপনায় মেতেছে। ব্যাপক অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। দলীয় ভিত্তিতে হওয়ার পর ইউপি নির্বাচন কি তবে সেই সৌন্দর্য হারানোর দিকে যাচ্ছে? নাকি ‘নির্বাচন’-এর অর্থ বা সংজ্ঞা স্থায়ীভাবে পরিবর্তনের উদ্যোগ–আয়োজন চলছে?
তবে মনে হচ্ছে, এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কিছুটা হলেও ‘নির্বাচন’ হয়ে উঠবে বা নির্বাচন বলতে যে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বোঝায় তার স্বাদ হয়তো মিলবে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কল্যাণে। হোক না আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ, তা-ও তো প্রতিদ্বন্দ্বিতা! ভাগ্যিস আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা রয়েছেন!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
[email protected]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *