ফিরে এলো হরতাল-অবরোধ, অর্থনীতির কী হবে?

Slider অর্থ ও বাণিজ্য


দেশে আবারও হরতাল-অবরোধের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। হরতাল রাজনৈতিক দাবি আদায়ের কৌশল হলেও দেশের অর্থনীতির জন্য এটি চরম ক্ষতিকর। বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াত দেশে এই ক্ষতিকর কর্মসূচি এমন সময়ে আবার শুরু করলো, যখন কোভিড মহামারির ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ডলার সংকট, রিজার্ভ কমে যাওয়া, জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিসহ অর্থনীতির সব সূচক নিম্নমুখী। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে ভয়ানক বিপদ ডেকে আনবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার অংশ হিসেবে হরতাল, অবরোধ জ্বালাও-পোড়াও, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, যান চলাচল ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং ভাঙচুরের ঘটনার প্রভাব ব্যবসায়ী ও সাধারণের আয় রোজগারের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হরতাল অবরোধে বহুমুখী ক্ষতির সম্মুখীন হয় দেশ। যদিও ক্ষতির প্রকৃত তথ্য কারও কাছেই নেই। তবে ব্যবসায়ী নেতারা দাবি করেন— হরতাল অবরোধে দিনে অন্তত সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে।

এখন থেকে ১০ বছর আগে ঢাকা চেম্বারের এক গবেষণায় উঠে আসে— একদিনের হরতালে তখন আর্থিক ক্ষতি হতো ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে অর্থনীতির আকার ৪ গুণ বেড়েছে। ফলে এ সময়ের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে ক্ষতিও সেই হারেই বাড়বে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হরতাল অবরোধ এভাবে চলতে থাকলে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক পণ্যের আনা-নেওয়া এবং আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ করবেন না। তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন। রাজনৈতিক এই অস্থিরতার সুযোগে অনেকেই টাকা পাচার করবেন। তাতে ডলার সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। এর নেতিবাচক প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও কমে যাবে।

এছাড়া দেশব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, যার প্রভাব গিয়ে ঠেকবে ভোক্তার চাহিদাকৃত পণ্যের ক্রয়মূল্যের ওপর। এছাড়া দোকানপাট খোলা না থাকলে এবং খেটে খাওয়া মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেলে অস্বাভাবিক হয়ে পড়বে জীবনযাত্রা। এতে করে সাধারণ মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠলে সার্বিকভাবে অর্থনীতি দীর্ঘ সংকটের মুখে ধাবিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দেশের ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘হরতাল-অবরোধে বহুমুখী ক্ষতি হয়। এর মধ্যে দিনে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।’ বিএনপি-জামায়াতের হরতাল ও অবরোধের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি বলেন, ‘হরতাল কিংবা অবরোধ অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। আমরা চাই, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।’

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এমনিতেই অর্থনীতি নানামুখী সংকটে নিমজ্জিত। রিজার্ভ কমে যাচ্ছে, রফতানি আয় কমে যাচ্ছে, প্রবাসী আয় কমে যাচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করা যাচ্ছে না, বিনিয়োগ হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে হরতাল-অবরোধ চলতে থাকলে অর্থনীতির আরও ক্ষতি হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এটা ঠিক না থাকলে দেশ ঠিক থাকবে না। রাজনীতিবিদের উচিত সংঘাতের দিকে না গিয়ে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পথ বেছে নেওয়া। তা না হলে অর্থনীতি আর সাধারণ মানুষ উভয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনীতি এবং মানুষকে জিম্মি করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার অধিকার কারও নেই। এই অধিকার কেউ তাদের দেয়নি। একইভাবে রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে কিছু নেই। একটা গোষ্ঠী পাওয়ারে থাকবে, আরেকটা বিরোধী অবস্থানে থাকবে। সবার রাজনৈতিক চর্চাই হবে দেশের স্বার্থে কাজ করা। এটা হচ্ছে না। হচ্ছে না বলেই একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।’

উল্লেখ্য, দীর্ঘ তিন বছর আট মাস পর গত রবিবার (২৯ অক্টোবর) হরতাল ডাকে বিএনপি। পরে জামায়াতে ইসলামীও হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে। এছাড়া ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত টানা তিনি দিন অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছে দল দুটিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো।

এর আগে বিরোধী দল বিএনপি সর্বশেষ হরতাল করেছিল ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। তখন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ওই হরতাল ডেকেছিল বিএনপি। তার আগে ২০১৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছিল বিএনপি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করার পর ২০১৫ সালে ওই নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে টানা তিন মাস হরতাল-অবরোধ পালন করে বিএনপি।

ওই হরতাল-অবরোধ ও আন্দোলন এক পর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। একের পর বাসে আগুন ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের মতো ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত হলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘হরতাল-অবরোধের কারণে অর্থনীতির সব সেক্টরেই ক্ষতি হয়, জানমালের ক্ষতি হয়, সম্পদের ক্ষতি হয়, অর্থনীতির ক্ষতি হয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে নানামুখী সমস্যার মধ্যে রয়েছে পোশাক খাত। এমন পরিস্থিতিতে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি চলতে থাকলে আমরা আর দাঁড়াতে পারবো না। তিনি বলেন, ‘নানা কারণে রফতানি অর্ডার কমছে। এখন যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না ফিরে হরতাল-অবরোধ অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশের অর্থনীতি নেতিবাচক ধারায় যাবে। এমনিতেই দেশের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন থেকে কমে ২০ বিলিয়নে নেমেছে। ইতোমধ্যে দ্রব্যমূল্যের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। বিরোধী দলগুলোর চলমান হরতাল-অবরোধ চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে অনিশ্চয়ত দেখা দেবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সময়মতো পণ্যের জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে রফতানির লিড টাইম বেড়ে যাবে। এ সুযোগে বায়াররা তাদের ক্রয়াদেশ আরও কমিয়ে দেবে। আগের দেওয়া ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করতে দেরি করবে। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে কালো মেঘ আরও গভীর হবে।’

তৈরি পোশাক মালিকদের আরেক সংগঠন বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘মহামারি করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তারপর ডলার সংকটের কারণে আমরা এমনিতেই বিপদের মধ্যে পড়েছি। নতুন করে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি অর্থনীতির জন্য বিপদ ডেকে আনবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *