সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে ৪ বার গণবিজ্ঞপ্তি বদল

Slider ফুলজান বিবির বাংলা


শীত সামনে রেখে প্রতিবছর বিদেশ থেকে সোয়েটার, জ্যাকেট, শার্ট, কম্বল, প্যান্ট ও সিনথেটিক কাপড় আমদানি করা হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ দরিদ্র মানুষের শীতের সহায় এসব কম দামের কাপড়। তবে এবারে এই কাপড় আমদানি বিলম্বিত করার চেষ্টা চলছে। আমদানির লাইসেন্স প্রদানের শিডিউল গত এক মাসের মধ্যে চারবার সংশোধন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ একটি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে বিজ্ঞপ্তিতে বদল আনা হচ্ছে।

পুরনো কাপড় আমদানির জন্য প্রতিবছর সারাদেশে ৩ হাজার পূর্বানুমতিপত্র (লাইসেন্স) দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের দপ্তরে জমা হওয়া আবেদন যাচাইয়ের পর পাঠানো হয় আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক দপ্তরে। আঞ্চলিক দপ্তর থেকে জারি করা পূর্বানুমতিপত্র নিয়ে ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র (এলসি) খোলেন। নির্দিষ্ট সময়ে আমদানি নিশ্চিত করতে সময় বেঁধেও দেওয়া হয়। আমদানি করা এসব কাপড় সাধারণত অক্টোবরের মধ্যে বন্দরে চলে আসে। তবে এবারে লাইসেন্স প্রদানের সময়সীমা ৩০ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে অবাক হয়েছেন পুরনো কাপড়ের ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, শীতের আগে শীতবস্ত্র আমদানি করতে না পারলে সেই কাপড় কেউ পরতে পারবে না। এতে বাজার সিন্ডিকেটের হাতে চলে যাবে। একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন আমদানিকারকের সিন্ডিকেটকে অতিরিক্ত সুবিধা পাইয়ে দিতে নিয়ম ভেঙে নতুন গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

জাপান, কোরিয়া ও ইউরোপের কিছু দেশ থেকে পুরনো কাপড় আমদানি হয়। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা এসব কাপড়ের বেশির ভাগ ব্যবহার হয় উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায়। এ নিয়ে চট্টগ্রাম ও রংপুরকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিন্ডিকেটের কাছে পুরনো কাপড়ের প্রচুর মজুদ থাকায় তারা আমদানি বিলম্বিত করতে চাইছে। এতে পুরনো কাপড় ব্যবসা একচেটিয়া হয়ে যাবে। ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণের সুযোগ পাবে তারা। নির্বাচনী বছরে এমন কিছু হলে সারাদেশে এর প্রভাব পড়তে পারে। আবার বাজারে অব্যবস্থাপনা হলে পথে বসবে সারাদেশের কয়েক লাখ হকার।

আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ২০১৯-২০, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের গণবিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অক্টোবরের মধ্যে পুরনো কাপড় দেশে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে আগেই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এবারই প্রথম এই বিজ্ঞপ্তিতে নানা কৌশল নিতে দেখা যাচ্ছে। ১০ জুলাই জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে ৩০ নভেম্বর কাপড় আমদানির পূর্বানুমতি জারি বা প্রদানের সর্বশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। আগ্রহী আমদানিকারকরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গণবিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে আমদানি লাইসেন্স ইস্যুর তারিখ এক মাস এগিয়ে অর্থাৎ ৫ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। আবার ২৮ আগস্ট একই বিষয়ে ৪র্থ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে দপ্তর। সহকারী নিয়ন্ত্রক মো. তারিকুল ইসলামের সই করা গণবিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, কাপড় আমদানির পূর্বানুমতিপত্র জারি বা লাইসেন্স ইস্যুর তারিখ প্রায় দুই মাস পিছিয়ে ৩০ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঋণপত্র খোলার পর পণ্য জাহাজীকরণ শেষে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছতে এক মাসের মতো সময় লাগে। নতুন গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী যদি ৩০ নভেম্বরের আমদানি অনুমতিপত্র দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়, তা হলে সেই পণ্য আসতে ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ চলে যাবে। তখন দেশে আর শীত মৌসুম থাকবে না।

পুরনো কাপড় আমদানির সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বাণিজ্যমন্ত্রীর এলাকার (উত্তরবঙ্গের) এক ব্যবসায়ী এবং চট্টগ্রামের কয়েকজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী সিন্ডিকটে করেছেন। তাদের আমদানি করা পুরনো কাপড় নগরীর খাতুনগঞ্জের গুদামে মজুদ আছে। সাধারণ আমদানিকারকের সংখ্যা কমে গেলে এ ব্যবসা তাদের জন্য একচেটিয়া হবে। আবার কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাজারে দামও বাড়ানো যাবে।

বারবার গণবিজ্ঞপ্তির তারিখ বদলের প্রভাব বাজারের ওপর পড়বে বলে জানান খাতুনগঞ্জ পুরনো কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, আগের অনুমতির প্রচুর পুরনো কাপড় আমদানিকারকদের হাতে আছে। চলতি শীত মৌসুমে কাপড়ের সরবরাহ সংকট তেমন হবে না। তবে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে পুরনো কাপড়ের দাম বাড়লেও কিছু করার থাকবে না। এটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *