বিদেশে বসে ‘ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড’ নিয়ন্ত্রণ

Slider সারাবিশ্ব


এখনও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড দেশের বাইরে থাকা তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দখলে। স্কুল-কলেজের ভর্তি বাণিজ্য, গরুর হাটের ইজারা, টেন্ডারবাজি বিদেশে বসেই নিয়ন্ত্রণ করে তারা। চাঁদাবাজির টাকা হুন্ডির মাধ্যমে চলে যায় তাদের পকেটে। আর তাদের নির্দেশে এসব বাস্তবায়ন করে দেশের আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা সন্ত্রাসীরা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিমূর্ল সম্ভব নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
গত ১২ মার্চ চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়ে দুবাই পাড়ি জমান মুসা। এর আগেই আওয়ামী লীগ নেতা টিপুকে হত্যা করতে ভাড়া করেন শুটার। দুবাই যাওয়ার সময় মুসা নগদ ৫ লাখ টাকা নিয়ে যান এবং পরবর্তীকালে তাকে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হয় আরও চার লাখ টাকা। এই ৯ লাখ টাকা মুসা তুলে দেয় টিপু হত্যার দিক নির্দেশনাকারী দুবাই পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের হাতে।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, প্রতি ঈদে মতিঝিল ও আশপাশের এলাকায় চারশ’ কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয়। এ চাঁদাবাজির টাকা আসে গরুর হাট, ফুটপাত, বাজার ইজারা, ডিস ও ইন্টারনেটসহ নানারকম টেন্ডারবাজি থেকে। এ অবৈধ টাকার একটি অংশ চলে যায় বিদেশে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের কাছে।

তথ্য বলছে, প্রতি বছর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রায় ৩০০ সিটে ভর্তি বাণিজ্য হয়। প্রতিটি সিট ৫ থেকে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এসব টাকার একটি অংশও যায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, হুন্ডির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজির টাকা যাচ্ছে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের কাছে। আর এ কাজে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে দেশের আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা সন্ত্রাসীরা।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, মুসা যখন বিদেশ যান, তখন তিনি সঙ্গে করে ৫ লাখ টাকা নিয়ে যান। পরবর্তীকালে হুন্ডির মাধ্যমে তাকে আরও ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এই ৯ লাখ টাকা হত্যাকাণ্ডে শুটার নিয়োগ দেওয়া বিদেশি সন্ত্রাসীদের চার্জ হিসেবে নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় দেখেছি, আন্ডারওয়ার্ল্ডের জিসান, প্রকাশ, বিকাশসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে। তাদের নাম বলে বিদেশ থেকে ফোন আসছে। আমরা টিপু হত্যার ঘটনা তদন্ত করার সময়ও ভুক্তভোগীকে বিদেশ থেকে ফোন করে বলা হয়েছে, এ মামলা নিয়ে যেন বাড়াবাড়ি না করা হয়। ভুক্তভোগী এ ব্যাপারে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

খন্দকার আল মঈন বলেন, বিদেশ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দেশে প্রভাব খাটাচ্ছে। তাদের প্রভাবে আমাদের দেশের অনেক ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সন্ত্রাসীদের টাকা পাঠাচ্ছেন। এ টাকা সংগ্রহ ও বিদেশ যাওয়াটাও একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হুন্ডির মাধ্যমে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় কিছু চক্র আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করে, তাদের মাধ্যমেও এ টাকা হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু অনেক সময় ভয়ের কারণে ভুক্তভোগীরা চক্রের নাম প্রকাশ করছেন না। তবে অনেক ভুক্তভোগী সাহস করে অভিযোগ করায় বিভিন্ন সময় আন্ডারগ্রাউন্ডের অনেককেই আমরা গ্রেফতার করেছি।

২০০১ সালে শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে সরকার। তাদের ধরিয়ে দিতে ঘোষণা করা হয় পুরস্কার। এ ২৩ সন্ত্রাসীর বেশিরভাগই পালিয়ে আছে দেশের বাইরে। কেউ দেশের কারাগারে। পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের নামে জারি রয়েছে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এ ধরনের সন্ত্রাসীদের নিমূর্ল করা সম্ভব নয়।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, বড় যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়, তার পেছনে বিভিন্ন ধরনের ইন্টারেস্ট থাকে। সেই ইন্টারেস্টের মূল বিষয় দুটি। সেগুলো হলো, আর্থিক এবং আধিপত্য বিস্তার। আর্থিক এবং আধিপত্য বিস্তারের যে প্রেক্ষাপটগুলো বাংলাদেশে দেখি, তা ছোট কোনো সন্ত্রাসী দলের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। এটি আসলে গোষ্ঠীগতভাবেই তারা নিয়ন্ত্রণ করে। সেই গোষ্ঠীর একটা পক্ষ বিদেশে অবস্থান করে, আরেকটা পক্ষ দেশে অবস্থান করে সরাসরি কাজ করে। তাদের উভয়ের মধ্যে যোগাযোগ আছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছ থেকেও তারা তথ্য সংগ্রহ করে। এভাবে তথ্য নিয়ে তারা অপরাধের নকশা তৈরি করে। এখানে বড় একটা বিষয় হচ্ছে, রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না হলে এ শীর্ষ সন্ত্রাসী হোক বা যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী হোক অথবা অপরাধ কর্মকাণ্ড হোক সেটা বন্ধ করা সম্ভব হবে না, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ইতিহাস বা কাহিনীও শেষ হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *