সহসাই গ্রেপ্তার হচ্ছেন না খালেদা জিয়া

Slider জাতীয়
99093_Khaleda_Zakir_DT
দেশে চলমান সংকটের দ্রুত অবসান চায় সরকার। এ লক্ষ্যে সরকারের নীতিনির্ধারকরা প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আইনগত কঠিন পদক্ষেপের পথে হাঁটছেন। তবে বুধবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও এর ভিত্তিতে এখনই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। সরকার খালেদা জিয়াকে আদালতে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিতে চায়। এ কারণে তারা খালেদাকে গ্রেপ্তারে আরো কিছুদিন অপেক্ষার কৌশল নিয়েছে। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে। তা ছাড়া পুলিশ প্রশাসন থেকেও একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকারের একজন মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় দুই মাস লাগাতার হরতাল-অবরোধ চালিয়ে যাওয়া খালেদা জিয়াকে অনড় অবস্থান থেকে সরাতে না পেরে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এ কাজ করতে গিয়ে যেন হিতে বিপরীত না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তাই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মন্ত্রী আরো বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার আগামী শুনানির দিন পর্যন্ত অপেক্ষার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। সেদিন যদি খালেদা হাজিরা দিতে যান তবে আদালত তাঁকে জেলে পাঠানো হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। এতে সরকারের কোনো দায় থাকবে না। আর যদি হাজিরা দিতে না যান তখন আদালতের নির্দেশমতো তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের জন্য সুবিধাজনক হবে। তখন দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মহলকে বোঝানো সহজ হবে যে খালেদা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। এ জন্য বাধ্য হয়ে সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।’
বুধবার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি ও তাঁকে গ্রেপ্তারের সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটি একটি রুটিনমাফিক ওয়ারেন্ট। মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর জন্য এ পরোয়ানা জারি ছাড়া আদালতের কোনো গত্যন্তর ছিল না। ফলে এ পরোয়ানা অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে এখনই গ্রেপ্তারের প্রশ্ন নেই।’
সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘আশা করি, খালেদা জিয়া আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আগামী হাজিরার দিনে আদালতে উপস্থিত হয়ে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ মোকাবিলা করবেন।’
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরাতে খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার ও আওয়ামী লীগের আছে। কিন্তু এটি কিভাবে, কবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে একাধিক মত রয়েছে। কেউ মনে করেন, এখনই খালেদাকে গ্রেপ্তার করলে ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচি এক সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। আবার কেউ মনে করেন, আরেকটু সময় নিয়ে এ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এখনই খালেদাকে গ্রেপ্তার করা হলে দেশে-বিদেশে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কষ্টকর হবে।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা আরো বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এখনো কোনো সবুজ সংকেত দেওয়া হয়নি বলেই জানি।’ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, ‘খালেদার বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। আদালতের এ নির্দেশনা এখন আইন অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।’
সংকট উত্তরণে সরকারের ওপর চাপ আছে জানিয়ে লেনিন বলেন, ‘লাগাতার হরতাল-অবরোধে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, এটি অস্বীকার করার জো নেই। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছেন, এসব ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিতে আমাদের কী বিপুল পরিমাণ অর্থের ক্ষতি হয়েছে। এটি কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে। এ ক্ষতির জন্য দায়ী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
ক্ষমতাসীন দলীয় সূত্র জানায়, সরকারের এখন প্রথম প্রাধান্য দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা। এর জন্য তারা সর্বোচ্চ কঠোরতা দেখাতে পিছপা হবে না। এ লক্ষ্যেই খালেদাকে গ্রেপ্তারের পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি করা হচ্ছে। একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে জনমত গঠনের কাজ চলছে। একেকটি পদক্ষেপের পরে সরকার সেটির লাভ-ক্ষতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। বুধবার খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর বিভিন্ন মহলে কী প্রতিক্রিয়া হয়, তাতে নজর রাখা হচ্ছে। পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা জানান, মূলত তিন চাপে সরকার চলমান সংকটের দ্রুত শেষ দেখতে চায়। প্রথমত, দেশের অস্বাভাবিক অবস্থার দ্রুত উন্নয়নে সরকারের ওপর বিদেশি বন্ধু দেশগুলোর তাগাদা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, লাগাতার হরতাল-অবরোধে দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এটি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবে বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে। তৃতীয়ত, নাজুক পরিস্থিতির কারণে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মহলকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুচিত ছাড় দিতে হচ্ছে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তাদের কাছে সরকারকে নমনীয় থাকতে হচ্ছে। দলীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, মূলত এ তিন কারণে সরকার দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনেকের ধারণা, খালেদাকে গ্রেপ্তার করা হলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ঝিমিয়ে পড়া হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহারে বাধ্য হবেন ২০ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারা। খালেদার অনুপস্থিতিতে কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বিএনপির অভ্যন্তরেই মতপার্থক্য দেখা দেবে, যাতে ২০ দলকে মোকাবিলায় সরকারের জন্য একটি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি হবে।
সূত্র জানায়, খালেদাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেই গত এক মাসেরও কিছু বেশি সময় ধরে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট সহিংসতার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে লাগাতার কর্মসূচি পালন করছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সংগঠনও নাশকতার প্রতিবাদে রাজপথে নামছে। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে একদল প্রতিবাদী মানুষ চলমান হরতাল-অবরোধে নিহত ৫৪ জনের তালিকা টাঙিয়ে দিয়েছে। এসবই করা হচ্ছে খালেদাকে গ্রেপ্তারের পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে। এরই মধ্যে বুধবার আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করায় খালেদাকে গ্রেপ্তারে আইনগত বৈধতা পেয়েছে সরকার।
পুলিশেও ইঙ্গিত নেই : ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আটক ও গ্রেপ্তারের সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে গত মাসেই। এর পর চলছে সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশল নির্ধারণের কাজ। তবে খুব দ্রুত তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এমন ইঙ্গিত তাদের কাছে নেই। দুর্নীতির মামলায় যে পরোয়ানা জারি হয়েছে সে ক্ষেত্রে তিনি যদি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে সুরাহা করেন, তবে পুলিশ বিষয়টিতে কিছু করবে না। আর তা না করলে আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক তাকে গ্রেপ্তার করেই আদালতে উপস্থাপন করা হবে। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে পরিস্থিতি এবং সরকারের মনোভাবের ওপর।
সর্বশেষ পরোয়ানা জারি বিষয়ে পুলিশের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হলেও পুলিশ তা তামিলের জন্য তড়িঘড়ি করবে না। সরকারের পক্ষ থেকে সে রকম কোনো নির্দেশনা নেই। সতর্কতার সাথেই বিষয়টি দেখা হচ্ছে।

– See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2015/02/27/192754#sthash.1h9KqSIP.dpuf

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *