স্যার ফজলে হাসান আবেদ (১৯৩৬-২০১৯) এক মহীরুহের বিদায়

Slider জাতীয় টপ নিউজ সারাদেশ


বিশ্বের সর্ববৃহৎ এনজিও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ আর নেই। রাত সাড়ে আটটায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগছিলেন। রাতে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। ওদিকে ব্র্যাকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তার মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়ে বলা হয়, যে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে শান্ত থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষাই তিনি সবসময় আমাদের দিয়েছেন। জীবনভর যে সাহস আর ধৈর্যের প্রতিচ্ছবি আমরা তার মাঝে দেখেছি, সেই শক্তি নিয়েই আমরা তার স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান জানাব। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামীকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তার মরদেহ ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। দুপুর সাড়ে ১২টায় আর্মি স্টেডিয়ামেই জানাজা সম্পন্ন হবে। জানাজার পর ঢাকার বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে, এক ছেলে এবং তিন নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ব্র্যাককে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় রূপ দিয়ে চলতি বছরই দায়িত্ব থেকে অবসরে যান ফজলে হাসান আবেদ। অবসরের পর তাকে প্রতিষ্ঠানটির ইমেরিটাস চেয়ার নির্বাচিত করা হয়। ১৯৭২ সালে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করার পর সংস্থাটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভুমিকা রাখা আবেদ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ পুনর্গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখায় স্যার আবেদ বাংলাদেশ ও বিশ্বের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৮০ সালে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, ২০১১ সালে ওয়াইজ প্রাইজ অব এডুকেশন, ২০১৪ সালে লিও টলস্টয় ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেল, স্প্যানিশ অর্ডার অফ সিভিল ম্যারিট, ২০১৫ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। সর্বশেষ চলতি বছর তিনি সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সাউথ এশিয়ান ডায়াসপোরা অ্যাওয়ার্ড, শিক্ষায় ভূমিকা রাখায় ইয়াডান পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭শে এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচঙ্গে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন ভূস্বামী। তার মায়ের নাম সৈয়দা সুফিয়া খাতুন। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন ঐ অঞ্চলের জমিদার। আবেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে ও পরে ব্রিটেনের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি শেল অয়েল কোম্পানীতে অর্থনৈতিক কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। ফজলে হাসান আবেদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় হবিগঞ্জে। হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে দেশভাগের ঠিক আগে তার বাবা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে হবিগঞ্জ থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান। পরবর্তীতে তিনি চাচার চাকরিস্থলে ভর্তি হন কুমিল্লা জেলা স্কুলে।

সপ্তম থেকে অষ্টম শ্রেণি পযর্ন্ত সেখানেই লেখাপড়া করেন। এরপর চাচা জেলা জজ হিসেবে পাবনায় বদলি হওয়ায় তিনিও চাচার সঙ্গে পাবনায় চলে যান এবং পাবনা জেলা স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫৪ সালে এইচএসসি পাস করেন নটরডেম কলেজ থেকে। সে বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হন। নেভাল আর্কিটেকচারের কোর্স ছিল চার বছরের। দুবছর লেখাপড়া করে কোর্স অসমাপ্ত রেখে ১৯৫৬ সালে গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি ছেড়ে লন্ডন চলে যান এবং সেখানে ভর্তি হন অ্যাকাউন্টিংয়ে। এখানে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিংয়ের উপর চার বছরের প্রফেশনাল কোর্স পাস করেন ১৯৬২ সালে। এ ছাড়া তিনি ১৯৯৪ সালে কানাডার কুইনস ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টর অব ল এবং ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টর অব এডুকেশন ডিগ্রি লাভ করেন।

ব্র্যাকের জন্ম ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সিলেটের শাল্লায় যুদ্ধে বিধ্বস্ত একটি জনপদের মানুষজনের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিতে কাজ শুরু করেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *