ফের বাড়ছে পিয়াজের দাম

Slider অর্থ ও বাণিজ্য জাতীয় সারাদেশ


লাগামহীন পিয়াজের দাম আবারো বেড়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় এই পণ্যটির বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। বাজারও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। গত দুই দিনে বিভিন্ন খবরে ঢাকার পাইকারি বাজারে পিয়াজের কেজি ১৬০ টাকায় নামার পর আবারও ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি খুচরা বাজারেও দাম বাড়তে শুরু করেছে। ঢাকার বাইরে ২৫০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, গত বছর এ সময় পিয়াজের কেজি ছিল ২৫ থেকে ৪০ টাকা। রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এ চিত্র উঠে এসেছে।
মাত্রাতিরিক্ত দামে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, আগের মতো সিন্ডিকেট করে ফের পিয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, যখন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি থাকে, তখন বিক্রেতারা সুযোগ নেন। প্রতিদিনের ভোগ্যপণ্য হওয়ায় ভোক্তাকে কিছু পরিমাণে হলেও কিনতে হয়। এই সুযোগ নিয়েছেন বিক্রেতারা।

জানা গেছে, গত ৪ মাস ধরেই দেশের পিয়াজের বাজার অস্থিতিশীল। এ সময়ের মধ্যে কখনও দাম বাড়ছে আবার কখনো কিছুটা কমছে। এর মধ্যে ভারত রপ্তানি বন্ধ করার পর দুই মাস ধরে দাম বাড়তে বাড়তে গত সপ্তাহের শুরুতে দেশি পিয়াজের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রতিকেজি ২৬০ টাকায় পৌঁছেছিল। সেই সঙ্গে মিয়ানমার, মিশর, চীন ও তুরস্কের পিয়াজের দামও বেড়েছিল পাল্লা দিয়ে। এরপর ফরিদপুর, পাবনা, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলার বাজারে নতুন মুড়িকাটা পিয়াজ ওঠার পাশাপাশি কার্গো বিমানে করে বিদেশ থেকে পিয়াজ আনার ঘোষণায় দাম কমতে থাকে। দুই-তিন দিনের মধ্যে কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা কমে ১৫০-১৬০ টাকায় চলে আসে দেশি পিয়াজের কেজি। এরমধ্যে নতুন সড়ক আইন সংশোধনের দাবিতে বুধবার পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটের দিন থেকেই পিয়াজের দাম আবার বাড়তে থাকে। গত দুই দিন ধরে পাইকারি বাজারে পিয়াজের দাম আবারও দুইশ’র ঘরে চলে গেছে।
এ অবস্থায় পাইকারি বাজারের সঙ্গে খুচরায়ও দাম বেড়েছে পিয়াজের। বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে রাজধানীর খুচরা বাজারে দেশি পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি দরে, মিয়ানমারের পিয়াজ ১৮০ টাকা, মিশর ও চীনের পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে।

রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারখ্যাত শ্যামবাজারে কেজিপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে দেশি পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি দরে, মিয়ানমারের পিয়াজ ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়, মিশরের পিয়াজ ১০০ থেকে ১০৪ টাকায়, চীনা পিয়াজ ১০০ টাকায়, পাকিস্তান থেকে প্লেনযোগে আসা পিয়াজ ১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে কাওরান বাজারের পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে দেশি পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে, মিয়ানমারের পিয়াজ ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়, মিশরের পিয়াজ ১১০ থেকে ১১৬ টাকায়, চীনা পিয়াজ ১০০ থেকে ১০৫ টাকা কেজি দরে।
এদিকে খুচরা বাজার শান্তিনগর, সেগুন বাগিচা বাজারে দেশি পিয়াজ খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি দরে, মিয়ানমারের পিয়াজ ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়, মিশরের পিয়াজ ১২০ থেকে ১২৫ টাকায়, চীনা পিয়াজ ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া এসব বাজারে নতুন দেশি পিয়াজ কেজিপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা, গাছসহ পিয়াজ ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে।
পিয়াজের দাম নিয়ে সরকারি সংস্থা টিসিবি বলছে, গত এক মাসে পণ্যটি গড়ে ৭৮.৩৮ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। আর গত বছরের তুলনায় এ সময় পণ্যটি ৪০৭.৬৯ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশি পিয়াজ একেবারে ফুরিয়ে আসায় দাম একটু বেশি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট থেকে ১৮ই নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ৮টি কাস্টম বন্দর দিয়ে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৬.৪৭ টন পিয়াজ আমদানি করা হয়েছে। আর আমদানি করা এই পিয়াজের মূল্য ৬৬০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারত থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে ৬৬ হাজার টন পিয়াজ আমদানির অনুমতি পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজার টন পিয়াজ দেশে এসেছে। বাকি পিয়াজ এখনো আসেনি।
সূত্র জানায়, আমদানিকারকেরা কাস্টমসের কাছে পিয়াজ কেনার যে তথ্য দেন, তাতে গড়ে প্রতি কেজি দর পড়েছিল ৪৬ টাকা। বন্দর থেকে খালাসসহ আনুষঙ্গিক খরচ ও মুনাফাসহ (১০ শতাংশ) আমদানিকারক পর্যায়ে তা সাড়ে ৫৪ টাকা বিক্রয়মূল্য হওয়া উচিত ছিল। এরপর পাইকারিতে ৫৭ টাকার একটু বেশি এবং খুচরা পর্যায়ে ৬৪ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া উচিত ছিল।
মগবাজারের পেয়ারাবাগের সবজি বিক্রেতা মো. হানিফ মিয়া জানান, মঙ্গলবার কাওরানবাজার যে পিয়াজ ১৪০ টাকা কেজি দরে কিনতে পেরেছেন, বুধবার তার দাম ১৫০ টাকা দিতে হয়েছে তাকে। তাই তিনি আগের দিন ১৫০ টাকা কেজিতে পিয়াজ বিক্রি করলেও পরদিনই ১৬০ টাকা দাম রাখছিলেন।
সুপারশপ স্বপ্ন ও মীনা বাজারেও দেশি পিয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। মীনাবাজারের মগবাজার শাখায় অন্য কোনো পিয়াজ না থাকলেও স্বপ্ন-এর সেন্ট্রাল রোড শাখার ম্যানেজার সাব্বির জানান, তাদের ওখানে আমদানি করা পিয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, দাম কেজিপ্রতি ১৩০ টাকা।

তবে মগবাজারের মধুবাগ ভাই ভাই স্টোরে দেশি পিয়াজ প্রতিকেজি ২০০ টাকা এবং মিশরীয় পিয়াজ ১৩০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। গত মঙ্গলবারও দেশি পিয়াজ ১৭০ টাকা থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল এই বাজারে।
এই দোকানের বিক্রেতা বলেন, তিন দিন আগে পাইকারি বাজারে দাম কমলেও এখন আবার বেড়ে গেছে। তাই তারাও দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। বাজারে দেশি পিয়াজের খুব সঙ্কট বলে জানান তিনি।
শ্যামবাজারের ইমাম ট্রেডার্সের পরিচালক ইদ্রিস আলী বলেন, বাজারে পিয়াজের আমদানি খুবই কম। তাই দাম একটু ঊর্ধমুখী। এছাড়া প্লেনযোগে আসা পাকিস্তানি পিয়াজের দাম বেশি। আমদানি বেশি হলে দাম কমে আসবে। এদিকে বিদেশ থেকে কার্গো বিমানে দুই দফায় প্রায় ১০০ টনের মতো পিয়াজ দেশে এসেছে। টিসিবি’র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সরকার টিসিবির মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করবে। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই। অন্যদিকে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় অব্যাহত রয়েছে টিসিবির খোলা বাজারে ট্রাকসেলে পিয়াজ বিক্রি। দীর্ঘ সময় ধরে সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে পিয়াজ কিনতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। প্রতিদিন একেকটি ট্রাকযোগে ১ হাজার কেজি পিয়াজ বিক্রি করছে, যা দুপুরের আগেই শেষ হয়ে যায়। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদের বিক্রি অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে।

পরিসংখ্যানে গড়মিল: দেশে পিয়াজের বার্ষিক চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানির পরিসংখ্যানে অস্পষ্টতা আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ (২০১৬) খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুসারে, দেশে দৈনিক একজন মানুষ গড়ে ৩১ গ্রাম পিয়াজ খেয়ে থাকেন, যা ২০১০ সালে ছিল ২২ গ্রাম। অর্থাৎ ৫ বছরে পিয়াজের মাথাপিছু ভোগ বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৩ লাখ (শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৭, বিবিএস)। সে হিসাবে দেশে বছরে পিয়াজের ন্যূনতম চাহিদা হয় অন্তত ১৯ লাখ টন। গত মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে পিয়াজের দৈনিক চাহিদা ৬ হাজার টন। অর্থাৎ বছরে চাহিদা প্রায় ২২ লাখ টন। তবে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের প্রাক্কলন অনুসারে, বছরে চাহিদা অন্তত ২৪ লাখ টন। পিয়াজের বছরে উৎপাদনের পরিসংখ্যানেই কোনো মিল নেই।
বিবিএসের হিসাবে, ২০১৮ সালে (২০১৭-১৮) দেশে ১৭ লাখ ৩০ হাজার টন পিয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগের হিসাব অনুসারে, এই সময়ে উৎপাদিত পিয়াজের পরিমাণ ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। অর্থাৎ দুই সরকারি সংস্থার হিসাবে, পিয়াজের উৎপাদনে ৬ লাখ টন গরমিল। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে দেশে উৎপাদিত পিয়াজের অন্তত ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়। ফলে দেশীয় পিয়াজের সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ বাজারে আসে। এটি বিবেচনায় নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব আমলে নিলে বছরে ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টন পিয়াজ আমদানি করা প্রয়োজন।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ১১ লাখ টন পিয়াজ আমদানি করা হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৯ লাখ টন। বিবিএসের উৎপাদন হিসাব আমলে নিয়ে ও তা থেকে ২৫ শতাংশ বাদ দিলে আমদানি করতে হয় সাড়ে ৯ থেকে ১০ লাখ টন পিয়াজ। সুতরাং পিয়াজের চাহিদা- যোগানের ভারসাম্য ঠিক রাখতে হলে প্রকৃত চাহিদা ও প্রকৃত উৎপাদন নির্ণয় করা জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *