পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ইমরান খানের পক্ষে কাজ করছে

Slider সারাদেশ

126929_aaaa
ঢাকা: পাকিস্তানে ‘ডার্টি’ বা নোংরা নির্বাচন আর মাত্র তিন দিন পরেই। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার ও ভীতি প্রদর্শনে এ নির্বাচন নিয়ে আতঙ্ক গ্রাস করেছে দেশটিকে। অধিকার বিষয়ক কর্মীরা বলছেন, দেশটির শক্তিধর সেনাবাহিনী বুধবারের নির্বাচনে ইমরান খানের পক্ষে কাজ করছে।
সেনাবাহিনী এমনটা অস্বীকার করলেও মিডিয়ায় এমনই রিপোর্টে সয়লাব। লন্ডন থেকে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ানে এ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। লাহোর থেকে রিপোর্টটি লিখেছেন সাংবাদিক মেহরিন জাহরা-মালিক।

তিনি লিখেছেন, এ সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ক্রিকেটার কাম রাজনীতিক ইমরান খানের পক্ষে পর্দার আড়ালে কাজ করছে সেনাবাহিনী। এমন ব্যাপক ও বিস্তৃত অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে দেশটিতে দ্বিতীয়বার গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার যে পালাবদল হওয়ার কথা তা অনেকটা হুমকিতে পড়েছে। বুধবারের এ নির্বাচনকে দ্বি-মুখী লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএলএন) নওয়াজ শরীফ। যদিও তিনি এখন দুর্নীতির অভিযোগে জেলে রয়েছেন। কয়েক দশক ধরেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার বিরোধ লেগে আছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, পিএমএলএন আবার ক্ষমতায় ফিরে আসুক এমনটা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রত্যাশা করে না বললেই চলে। তারাই পর্দার আড়ালে ইঞ্জিনিয়ারিং করছে, যাতে পিএমএলএনের নির্বাচনী বড় আশা নষ্ট হয়ে যায়। পিএমএলএনের সদস্যরা হয়রানি ও তাদের নেতাকর্মীদের প্রচারণাকালে গ্রেপ্তারের অভিযোগ করেছে। অনেক সিনিয়র নেতা বলেছেন, তাদেরকে সরাসরি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা এজেন্সিগুলো থেকে হুমকি দেয়া হয়েছে। জোরপূর্বক তাদেরকে ইমরান খানের দলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। দলীয় ১৭০০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা চালু হয়েছে। দলীয় সিনিয়র বেশ কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে। আরেকটি বড় দল পাকিস্তান পিপলস পার্টিও (পিপিপি) অভিযোগ করেছে যে, তাদের প্রার্থীদেরকে আনুগত্য স্বীকার করে নিতে চাপ দিয়েছে সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংলিশ ভাষার দৈনিক পত্রিকা ডন সহানুভূতি দেখিয়েছে পিএমএলএনের প্রতি। তারা বলেছে, ডন পত্রিকার বিতরণে বাধা দেয়া হচ্ছে। অনেক সাংবাদিক ও অনলাইন কর্মী বলছেন, ইমরান খানের পিটিআইকে অনুমোদন দেয়ার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সমালোচনা বন্ধ করতে বলা হয়েছে। পিএমএলএনের নিউজ কভারেজ দিতে বারণ করা হয়েছে।
পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় অর্ধেকটা সময় তা সরাসরি শাসন করেছে সেনাবাহিনী। কিন্তু সাংবাদিক, রাজনীতিক, বিশ্লেষক ও অধিকার বিষয়ক কর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বেসামরিক মানুষের জীবনের ওপর এটাই সবচেয়ে বড় আক্রমণ। সাংবাদিক ও লেখক আহমেদ রশিদ বলেছেন, এবারের নির্বাচন হবে সবচেয়ে নোংরা, সবচেয়ে অসততার এবং জালিয়াতির। পাকিস্তানের জনগণ কখনো এমনটার মুখোমুখি হয় নি। তিনি আরো বলেছেন, বড় বড় রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজের গ্রুপগুলো ও সংখ্যালঘুরা এক সুরে কথা বলছেন। তারা বলছেন, এবারের নির্বাচন হবে জালিয়াতিতে পূর্ণ।
নওয়াজ শরীফকে ২০১৬ সালের পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে দুর্নীতির অভিযোগে জেলে ঢোকানো হয়েছে। ওই মামলায় দেখানো হয়েছে, নওয়াজ শরীফ অফসোর কোম্পানি ব্যবহার করে লন্ডনে বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন। তিনি ও তার পরিবার এমন অভিযোগকে ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করছেন। তারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাকে জেলে পাঠানোর পিছনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ আছে। কিন্তু সেনাবাহিনী তাও অস্বীকার করেছে।
১৩ই জুলাই নওয়াজ শরীফ ও তার মেয়ে মরিয়ম লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে। ওইদিন নওয়াজকে স্বাগত জানাতে লাহোর বিমানবন্দরে যেসব মানুষ, সমর্থক জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। ফলে নওয়াজ শরীফ ও তার মেয়ের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে এক বিরাট নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। নওয়াজ দেশে ফেরার কয়েকদিন আগে, নিরাপত্তার হুমকি দেখিয়ে নওয়াজের দলের কমপক্ষে ৬০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উপ পরিচালক ওমর ওয়ারিয়াচ বলেন, নওয়াজ শরীফকে সমর্থন করেন এই কারণে কয়েক শত মানুষকে খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এক সময় পাকিস্তানে রাজনৈতিক গতি ও তা টিকে থাকার জন্য বড় একটি স্থান ছিল। তা এখন এতটাই ক্ষুদ্র হয়েছে যে, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় চলে এসেছে।
নওয়াজ শরীফকে যখন অযোগ্য ঘোষণা করে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় গত বছর জুলাইয়ে তখন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শাহিদ খাকান আব্বাসি। তিনিও পিএমএলএনের একজন নেতা। আব্বাসি বলেছেন, তার দল সরকারে থাকা অবস্থায়ই নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ শুরু হয়েছে। তিন মাস আগে দলীয় এক সভায় তিনি বলেছিলেন, ওই বৈঠকে উপস্থিতদের অর্ধেকই বলেছেন, তাদের কাছে সেনাবাহিনীর লোক এসেছে। তারা তাদেরকে দল বদল করতে বলছে। গত মাসে পিএমএলএনের প্রার্থী রানা ইকবাল সিরাজ একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করেন। এতে তিনি বলেন, নওয়াজ শরীফের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করতে তাকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন নির্যাতন ও হুমকি দিয়েছে। এরপরই তিনি ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন।
মে মাসে পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে পিএমএলএনের ২১ জন রাজনীতিক আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন ইমরান খানের দল পিটিআইয়ে। নির্বাচনের আগে এর ফলে ইমরান খানের দল বড় শক্তি অর্জন করেছে। পিএমএলএনের টিকেটে নির্বাচন করছিলেন এমন ১১ জনেরও বেশি প্রার্থী এ মাসের শুরুর দিকে বলেছেন, তারা পিএমএলএনের হয়ে নির্বাচন করবেন না। তারা নির্বাচন করবেন নতুন প্রতীক ‘জিপ’ নিয়ে এবং তারা হবেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এই জিপ প্রতীকটি বরাদ্দ করা হয়েছে তাদের জন্য যাদেরকে পিএমএলএন থেকে সেনাবাহিনী বের করে আনতে পেরেছে এবং তাদেরকে দিয়ে একটি আমব্রেলা গ্রুপ তৈরি করেছে তাদের জন্য।
পিএমএলএনের অনেক সিনিয়র নেতার মনোনয়নপত্র প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসিও। তার পক্ষে উচ্চ আদালত রায় না দেয়া পর্যন্ত নির্বাচনে তাকে নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন বিষয়ক একটি ট্রাইব্যুনাল। আব্বাসি বলেছেন, অনেকেই আমাদের বিরুদ্ধে সব রকম ফাঁদ পাতার চেষ্টা করছেন। হতে পারে অকস্মাৎ দুর্নীতির তদন্ত। অথবা নির্বাচনী কর্মকর্তারা আমাদের মনোনয়নপত্রই গ্রহণ করছেন না। এটা আমাদের দলের বিরুদ্ধে একটি নৃশংস ও ভয়ানক আচরণ। এমনকি ধর্মীয় কিছু দল, বিশেষ করে এক সময় শিয়াদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দেয়ার দায়ে নিষিদ্ধ একটি দলের এক নেতা রয়েছেন এমন গ্রুপকে তাদের অতীত মুছে দিয়ে নির্বাচনে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পিএমএলএনের প্রভাবকে খর্ব করতে তাদেরকে ব্যবহার করা হয়েছে।
অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন এবার নির্বাচন হবে জালিয়াতির। এর ফলে পাকিস্তানে যে পার্লামেন্ট হবে তা হতে পারে ঝুলন্ত অথবা সরকার হবে দুর্বল জোটের। কুগেলম্যান বলেন, এমন সরকার বা প্রশাসন সেনাবাহিনী চায় না। কারণ, একক ম্যান্ডেট পাওয়া একটি সরকার থাকে ঐক্যবদ্ধ। সেখানে ওই রকম সরকার হয় ভঙ্গুর ও বিভক্ত। তাদেরকে সহজেই ভেঙে দেয়া যায়।
দেশজুড়ে নির্বাচনে তিন লাখ ৭১ হাজার সেনা সদস্য মোতায়েন হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন দল ও মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ। এসব সেনা সদস্যকে দেয়া হয়েছে ব্যাপক বিচারিক ক্ষমতা। অতীতে সেনাবাহিনী পাকিস্তানের বেশ কিছু সরকারের পতন ঘটিয়েছে। তাদেরকে এভাবে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়ায় পাকিস্তানের অপরিপক্ব গণতন্ত্রের ওপর দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। কুগেলম্যান বলেছেন, ক্ষতি যা হবার তা এরই মধ্যে হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে বেসামরিক ও সামরিক সম্পর্কের মধ্যে গভীর অসমতা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। পাকিস্তানের বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো ও নেতাদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার যে চেষ্টা তা কঠিন চ্যালেঞ্জর মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয় নি। তবে এ মাসের শুরুর দিকে সংবাদ সম্মেলন করেছেন মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গাফুর। তিনি নির্বাচনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। পিটিআইয়ের মুখপাত্র ফাওয়াদ চৌধুরী নির্বাচনের আগেই জালিয়াতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দলকে সমর্থন দিচ্ছে সেনাবাহিনী এমন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। তিনি বলেন, যদি নওয়াজ শরীফের সমর্থন থাকে তাহলে কোনো কর্নেল বা একজন মেজরের অনুরোধে কেউই তার দল ছাড়বে না। সেনাবাহিনী হয়তো কিছু লোককে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু তারা কি ২০ কোটি ৮০ লাখ মানুষের ভোট ইমরান খানের জন্য এনে দিতে পারে? এটাতো একটা কৌতুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *