ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন, মানুষ আতঙ্কে

Slider সারাদেশ
 0bcdcc1667f80d3369637eac39d0913e-5a7bb4e56b820

বিএনপির চেয়ারপারসন  খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আজ বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের সঙ্গে ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিএনপি কোনো কর্মসূচি না দিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এই মামলায় সাজা পেলে তা দেশের রাজনীতিতে বিশেষ বার্তা বয়ে আনতে পারে। স্বাধীনতার পর আইনি প্রক্রিয়ায় এই প্রথম কোনো সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিচারকাজ শেষ হচ্ছে। এই রায়ের প্রভাব চলমান রাজনীতি, আগামী নির্বাচন এবং সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।

বিএনপি কর্মসূচি ঘোষণা না করলেও রায় ঘিরে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী  বলেন, ‘বিএনপি তো কোনো কর্মসূচি দেয়নি। সেখানে সরকার একদিকে তাদের দলীয় বাহিনী, আরেক দিকে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি নামিয়ে অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অথচ সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের শান্তি-স্থিতি রক্ষা করা।’

অবশ্য পুলিশ বলছে, এসব করা হচ্ছে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে। দলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি নেই বলা হলেও রায়ের পর কিছু ঘটবে না, এটা বিশ্বাস করতে চায় না সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল রাতে বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি না হয়, সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের কাছে যতটুকু তথ্য আছে, সেটা বিবেচনা করে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত ৯ দিনে গ্রেপ্তার হয়েছেন দলটির প্রায় তিন হাজার নেতা-কর্মী। কয়েক দিন ধরে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে র‍্যাব-পুলিশের তল্লাশি চলছে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকায় ১০ হাজার পুলিশ ও ২০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে ৬৯ প্লাটুন বিজিবি, আরও ৬৫ প্লাটুন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে শহরজুড়ে বিরাজ করছিল থমথমে পরিস্থিতি।

কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি না থাকার পরও এত প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান  বলেন, একটা দায়িত্বশীল সরকারের এটাই দায়িত্ব হওয়া উচিত। ঘটনা ঘটার পর, নাকি ঘটনার আগে প্রস্তুতি নিয়ে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে? বর্তমান সরকার ঘটনা ঘটার আগেই যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে।

এদিকে আজ রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে মানুষের দৃষ্টি আদালতের দিকে, তেমনি শঙ্কাও সৃষ্টি হয়েছে। আজ এসএসসি পরীক্ষা রয়েছে। মিরপুরে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় স্টেট ম্যাচও শুরু হচ্ছে আজ সকালে। সকাল আটটায় রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল ও কলেজে উদ্বোধন হচ্ছে একাদশ জাতীয় বিজ্ঞান মেলা। গতকাল সন্ধ্যা থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া নগরীতে আজ সব মিলিয়ে জনজীবন কীভাবে অতিবাহিত হবে, তা নিয়ে সবাই চিন্তিত।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুল আলোচিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি দায়ের হয় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে। দুর্নীতি দমন কমিশন এই মামলা দায়ের করে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তাঁর পুত্র এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ছয়জন মামলার আসামি। আজ রায় ঘোষণার সময় খালেদা জিয়া আদালতে উপস্থিত থাকবেন।

খালেদা জিয়ার সাজা হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হবে কি না, হলে কোন কারাগারে রাখা হবে—এ নিয়ে সর্বত্র আলোচনা। এরই মধ্যে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের নারী সেলের দোতলার ঘরগুলোতে ধোয়ামোছার কাজ চলছে। আবার গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় নারী কারাগারের কথাও আলোচনায় আছে।

গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছেন। তবে রায় যা-ই হোক, উচ্চতর আদালতে দুই পক্ষেরই আপিলের সুযোগ থাকবে।

প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় এই মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৫(২) ধারার অভিযোগ (অর্থ আত্মসাৎ) প্রমাণিত হলে ৪০৯ ধারায় সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালত-৫-এ এই মামলার বিচারকাজ চলে। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ এই আদালতে মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ২৫ জানুয়ারি রায়ের তারিখ ঘোষণা করেন বিচারক মো. আখতারুজ্জামান।

এই মামলার শুনানির শেষ দিনে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন বলেছেন, মামলার প্রায় প্রতিটি কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করে আসামিপক্ষ বারবার উচ্চতর আদালতে গেছে। কিন্তু প্রতিবারই হেরে এসেছে। তাঁরা এই আদালতে যেসব যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন, উচ্চতর আদালতেও একই কথা বলেছেন। আর রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে মামলার অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, ১৯৯১ সালের ঘটনার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০০৭-০৮ সালে শুরু হতে পারে না। তদন্ত কর্মকর্তা কিছু কথা বলেছেন, যেগুলো সর্বৈব মিথ্যা। ঘষামাজা নথি ও মনগড়া তথ্য দিয়ে সাজানো মামলাটিতে যে কোনো সারবত্তা নেই, তা তাঁরা আদালতে প্রমাণ করতে পেরেছেন। তাই তিনি সব আসামির বেকসুর খালাস দাবি করেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। দলের নেতা-কর্মীরা সমবেত থাকবেন বলে দলীয় সূত্রে যে কথা শোনা গিয়েছিল, তা-ও নাকচ করে খালেদা জিয়া শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলনের কথা ঘোষণা করেছেন।

তবে গত ৩০ জানুয়ারি খালেদা জিয়া একটি মামলায় হাজিরা শেষে ফেরার পথে দলীয় নেতা-কর্মীরা পুলিশের ওপর চড়াও হওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থান নেয় এবং আটক-গ্রেপ্তার শুরু করে।

অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপি নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। তাই আওয়ামী লীগ সতর্ক অবস্থানে থাকবে এবং তাদের নেতা-কর্মীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য রাজপথে থাকবেন।

 গতকালই নগরীর হকার ও উদ্বাস্তুদের যথাসম্ভব রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পথচারীদের ওপর চলে কড়া নজরদারি। ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় যানবাহন আসা কমে যাওয়ায় গতকালই ঢাকা মহানগরী প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, আজও এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল রাজধানীর গাবতলী এলাকায় প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল ও দূরপাল্লার বাসে কঠোর তল্লাশি চালায় পুলিশ। গাবতলী ট্রাফিক পুলিশের সহকারী কমিশনার সাইফুল আলম  বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে গাবতলীতে ১০০ জন ট্রাফিক পুলিশ ডাবল শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন। আগে তাঁরা তিন শিফটে এ দায়িত্ব পালন করতেন। দারুস সালাম থানা-পুলিশও তাদের সঙ্গে তৎপর রয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব পুলিশ সদস্যের সাপ্তাহিক ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।

বিভিন্ন বাস কাউন্টারে গিয়ে সেখানে থাকা কর্তব্যরত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে থেকে গাড়ি কম আসছে। মূলত যাত্রীসংকট থাকার কারণেই বিভিন্ন জেলা থেকে বাস ছেড়ে আসতে পারছে না বলে তাঁরা জানান।

হানিফ পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা মাধব চন্দ্র দেব বলেন, অন্য দিন যেখানে তাঁদের ১২-১৩টি বাস ছেড়ে যায়, সেখানে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ছেড়েছে ৫টি। মহাখালী বাস টার্মিনালেও যাত্রীর সংখ্যা ছিল কম।

বুধবার বিকেল থেকেই গণপরিবহন এবং ব্যক্তিগত ও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলে অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হয়েছে। কর্মজীবী সাধারণ মানুষ আজ কীভাবে কর্মস্থলে যাতায়াত করবেন, তা নিয়ে উৎকণ্ঠা রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক  বলেন, সরকার বলছে, সহিংসতা প্রতিরোধে তাদের এই ব্যবস্থা। যেকোনো অজুহাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের ব্যাপক মোতায়েন জনগণের চলাচল, সমাবেশ, বাক্স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন কাজকর্ম অর্থাৎ সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

শাহদীন মালিকের মতে, কেউ অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে। কিন্তু সম্ভাব্য অপরাধের অজুহাতে পুরো রাজধানী এভাবে অবরুদ্ধ করা জনগণের অধিকারকে অশ্রদ্ধা করারই নামান্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *