চুয়াত্তরের বন্যায় দুঃসাধ্যতার মুখোমুখি হন বঙ্গবন্ধু

Slider গ্রাম বাংলা

base_1502738315-4

হিমালয়ের পাদদেশে নদ-নদীর স্ফীত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় রংপুরসহ এ অঞ্চলে বহুবার বন্যা দেখা দেয়। তবে ১৯৭৪ সালের বন্যা আগের সব ভয়াবহতাকে ছাড়িয়ে যায়। জেলার প্রায় ১ হাজার ২৯৬ বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়। তলিয়ে যায় ১ লাখ ৩৩ হাজার একর ফসল। জেলার প্রায় এক লাখ বাড়িঘর পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরো ৬৪ হাজার ঘরবাড়ি। ওই বন্যায় জেলার প্রায় ১ হাজার ৭৪৮টি গবাদিপশু মারা যায়। ভেঙে পড়ে জেলার পাঁচ হাজারের মতো ছোট-বড় পুল, সেতু, রাস্তঘাট, নদীতীর ও বাঁধ। ১ হাজার ৪২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বিনষ্ট হয়।

স্বাধীনতার পর দুই বছর খরায় আউশ ও আমনের ব্যাপক ক্ষতির পর আসে ’৭৪-এর ওই বন্যা। সে বছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। ব্রহ্মপুত্র নদও বিধ্বংসী হতে থাকে এবং বন্যা দেখা দেয়। মধ্য আগস্টেই তা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ ভাসিয়ে নেয়। গ্রীষ্মকালীন ফসলের ৮০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেস্তে যায় কৃষকের শীতকালীন ফসল চাষের প্রস্তুতিও। সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার, যা ওই অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ১৬৮ শতাংশ। ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে সরকারের বাজেট প্রস্তাবনা ছিল ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকার।

জনগণের দুর্ভোগের কাছে এসব পরিসংখ্যান কিছুই না। বন্যার পানি বাড়তে শুরু করলে দূরদর্শী অনেক পরিবারই বাড়ির পার্শ্ববর্তী গাছের ওপর মাচা বেঁধে রেখেছিল। তাদের আশঙ্কাকে সত্যি করে সে সময় তলিয়ে যায় শতশত বাড়িঘর। একদিকে দুনিয়া বিচ্ছিন্ন, অন্যদিকে পুরো ফসল পানির তলায়।

১৯৭৪ সালের বন্যায় প্রায় এক মাস পানির নিচে ছিল সুনামগঞ্জের বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল্লাহর গ্রাম। গ্রামের চার হাজার বাসিন্দার অনেকেই এ দীর্ঘ সময় পার করেছেন স্থানীয় স্কুলঘরের ছাদে। গাদাগাদি করে উঁচু গাছের ওপরও ছিলেন অনেকে। বন্যার পুরো সময়টাই তাদের কেটেছে অনাহারে-অর্ধাহারে। মজুদ চাল নিঃশেষ, অবশিষ্ট যা ছিল কয়েকটি গবাদিপশু। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদককে ওই সময় মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘এগুলোর মাংস খেতে পারি আমরা, কিন্তু রাঁধব কী দিয়ে। আমাদের কাছে কোনো জ্বালানি নেই। চালের মজুদ যাওবা ছিল, ফুরিয়েছে। প্রাণ বেঁচেছে পরের মৌসুমের জন্য জমিয়ে রাখা ধানের বীজ খেয়ে।’

’৭৪-এর বন্যার ভয়াবহতার চিত্র উঠে আসে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনেও। দুর্গত এলাকায় মহামারী আকার ধারণ করেছে কলেরা। ওই বছরের ৮ আগস্ট ইত্তেফাক প্রধান শিরোনাম করে, ‘প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়িয়া চলিয়াছে’। ভয়েস অব আমেরিকা জানায়, মৃতের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আড়াই কোটি মানুষ। গবাদিপশু মারা গেছে ৪০ হাজার। এর দুদিনের মাথায় ১০ আগস্ট ইত্তেফাকের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৬ দিনের বন্যায় দেশের ৫৪ হাজার বর্গমাইল এলাকার মধ্যে ৩৪ হাজার বর্গমাইলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সাপ্তাহিক বিচিত্রার তথ্য অনুযায়ী, বন্যার ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে, জামালপুরে ১৫টি ইউনিয়নে মরদেহ দাফনের মতো শুকনো জায়গাও ছিল না। কুড়িগ্রামের চিলমারী রেললাইনের পাশে একটি গণসমাধি তৈরি করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাবে রাজধানীর ১২৪টি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেয় ৮৫ হাজার ৭০০ মানুষ। বন্যা পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তত্কালীন শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘এমন বন্যা আর দেখি নাই।’

ভয়াবহ ওই বন্যায় বেকার হয়ে পড়েন ২৭ লাখ শ্রমজীবী। গৃহহারা হয় এক কোটি মানুষ। বন্যাদুর্গতদের ত্রাণের জন্য অবিলম্বে প্রয়োজন দেখা দেয় প্রায় ৩৬৭ কোটি টাকার। ১৯৭৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বন্যার কারণে ব্যাপক খাদ্য সংকট দেখা দেয়। প্রতিকূলতা মোকাবেলায় সব ধরনের চেষ্টা চালায় সরকার। বিদেশ থেকে খাদ্য এনে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যদিও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি খুব একটা অনুকূলে ছিল না। ১৯৭৪ সালে চার লাখ টন খাদ্য সংগ্রহের লক্ষ্য ঘোষণা করলেও মাত্র ৭১ হাজার টন চাল সংগ্রহে সমর্থ্য হয় সরকার। বেঁচে থাকার রসদ ক্রমেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। ভাগ্যগুণে পাওয়া গেলেও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, ১৯৭২ সালের জুনে মণপ্রতি চালের দাম ছিল ৭১ টাকা। এক বছর পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৬ টাকায়। ১৯৭৪ সালের জুনে ১৬২ আর ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি নাগাদ চালের দাম মণপ্রতি ৩৩০ টাকায় উঠে যায়। শুধু চাল নয়, ১২ টাকার প্রতি সের সরিষার তেল দুই বছরের ব্যবধানে উঠে যায় ৪১ টাকায়। গুড়, লবণ সবকিছুর দামই কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

দেশের বাজারে মোটা ও মধ্যম মানের চালের গড়পড়তা মূল্যবৃদ্ধির তথ্য রয়েছে মহিউদ্দিন আলমগীরের ‘ফেমিন ১৯৭৪: পলিটিক্যাল ইকোনমি অব মাস স্টার্ভেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গ্রন্থেও। ওই গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে প্রতি মণ চালের দাম ছিল ৮৯ টাকা ৬০ পয়সা। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে তা ১২০ টাকা ৫০ পয়সায় উন্নীত হয়। পরের অর্থবছরে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৪ টাকা ৪০ পয়সা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *