আমার কথাই সত্য সালমান শাহকে খুনই করা হয়েছে

খেলা নারী ও শিশু

77907_f1

সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ। ভারি হচ্ছে পরিবেশ। ২১ বছর ধরেই কেঁদে চলেছেন তিনি। চিত্র নায়ক সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমার কথাই সত্য হলো। সালমানকে খুনই করা হয়েছে। পুত্রের মৃত্যু তাকে রাজনীতি, সমাজ-সামাজিকতা সব কিছু থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে দীর্ঘদিন তিনি লন্ডনে বাস করছেন। এ নিয়ে লন্ডনে একটি প্রেস কনফারেন্সও করছেন তিনি। ম্যানচেস্টারের কাছে রচডেলে বসবাসরত নীলা বলেন, আমি সব সময়ই বলেছি আমার ইমনকে (সালমান শাহ) খুন করা হয়েছে। কিন্তু সামিরা (তার স্ত্রী) গংরা যে কোনো কায়দায় এটাকে ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আজ আল্লাহ আমার সহায় হয়েছেন। আমার এতদিনের ইবাদতের ফসল আমি পেয়েছি। খুনিরা ‘খুন’কে ঢাকা দেয়ার নানা ফন্দি ফিকির করে। কিন্তু তারাই এক সময় পাগল হয়ে আলামত প্রকাশ করে। রুবির বেলায়ও তাই ঘটেছে। অন্য অপরাধীরা এক সময় অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য হবে। আমি নিশ্চিত ইমনের খুনের যে বর্ণনা রুবি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তা দেখেছেন। এখন আমার একটাই চাওয়া, রুবিকে এফবিআই’র মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় তার জবানবন্দি নেয়া হোক। তাহলে সত্য উদ্ঘাটন হবে। ইমনের আত্মা শান্তি পাবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের অধীনে অনেক খুনের বিচার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাহলে সালমান শাহ হত্যার বিচার হবে না কেন? তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তিনি বাবা-মা হারিয়েছেন। সন্তানের মত একটা ভাই হারিয়েছেন। হারানোর কষ্ট তিনি বুঝেন। আমি আমার ছেলেকে আর ফিরে পাবো না। তবে তার হত্যার বিচারটুকু দেখে যেতে পারলে আমিও শান্তি পাবো। কিন্তু কি কারণে সালমানকে খুন করা হতে পারে? এমন প্রশ্নে নীলা বলেন, ‘কোনো একটি ঘটনা’ তো আছেই। সেটি সামিরার পরিবারের সঙ্গে। পারিবারিক কলহ থেকে এই হত্যা বলে সন্দেহ নীলা চৌধুরীর। তিনি বলেন, এখনও মিথ্যাচার চলছে। বলা হচ্ছে সালমান শাহ’র লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এটা বনোয়াট। খুনকে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রমাণের জন্য নতুন এ গল্প বানাচ্ছে সামিরার পরিবার। সালমান শাহ’র শরীরে সিরিঞ্জ নিয়ে বাতাস পুশ করে হত্যা করা হয়েছে এমন দাবি করে নীলা চৌধুরী বলেন, আমার ছোট ছেলেকেও খুন করার পাঁয়তারা করা হয়েছিল। সেই সময়ে রিজভী নামের এক আসামি ধরা পড়েছিল। তার জবানবন্দিতেও এটা আছে। সালমান শাহ’র লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। তার হাত-পায়ের নখ নীল ছিল। নীলা চৌধুরী বলেন, লন্ডনেও ইয়াসমিন নামে একজন আসামি আছেন। তাকেও ফেরত নেয়া হোক। চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির দ্রুত বিচার দাবি করে তিনি বলেন, এটা আজ কেবল আমার, নীলা চৌধুরীর একার দাবি নয়, দেশের ষোল কোটি মানুষের দাবি। সালমান শাহ’র হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ‘অভিযুক্ত’ রাবেয়া সুলতানা রুবি বলেন, আত্মহত্যা নয়, ইমনকে (সালমান শাহ) হত্যা করা হয়েছে। তারই স্ত্রী সামিরা হকের পরিবার তাকে খুন করিয়েছে। খুনের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনায় রুবি বলেন, “ইমনরে (সালমান শাহ) সামিরা, আমার হাজব্যান্ড ও সামিরার সমস্ত ফ্যামিলি সবাই মিলে খুন করছে। ইমনরে আমার ভাই রুমিকে দিয়ে খুন করানো হইছে। রুমিকেও খুন করানো হইছে। আমি জানি না, আমার ভাইয়ের কবর কোথায় আছে। রুমির লাশ যদি কবর থেকে তুলে পোস্টমর্টেম করে, তাহলে দেখা যাবে রুমিরে গলা টিপে মেরে ফেলা হইছে।” এ বিষয়ে নীলা চৌধুরী বারবার বলেন, রুবি আজ ঘটনার স্বীকারোক্তি দিচ্ছে। সে জানিয়েছে তার ভাইকেও খুন করে গুম করে দেয়া হয়েছে। সে দেশে ফিরে স্বীকারুক্তি দেবে। সে তো নিজে এসে সাক্ষী দিতে চাইছে। এটাই আল্লাহ’র বিচার। সবাই মিলে এটি ধামাচাপ দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আজ সে নিজেই মুখ খুলছে। অথচ এক সময় এই রুবিকে দিয়েই তারা আমাদের দুশ্চরিত্র প্রমাণের চেষ্টা করেছিল। সে আমার ছেলেকেও খারাপ বলেছে। গালি দিয়েছে। আজ কিছু একটা হয়েছে, তাই সে সত্য প্রকাশ করেছে। নীলা চৌধুরী বলেন, আমি সালমানের ভক্তদেরও বলেছি, ওরা আমাকে চরিত্রহীন প্রমাণে চেষ্টা চালাতে পারে, কিন্তু এতে কি তারা আমার ছেলের খুনকে বদলে ফেলতে পারবে? রুবির বক্তব্য প্রচারের পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করেছেন সামিরার বাবা জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা। এতদিন পর রুবির এ ধরনের বক্তব্যের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহও প্রকাশ করেছেন তিনি। এ বিষয়ে নীলা চৌধুরী বলেন, আসামিরা নিজেদের বাঁচাতে অনেক কিছুই বলে। কোনো পাগলও তো এই স্টেটমেন্টটা (রুবির দেওয়া বক্তব্য) ছেড়ে দেবে না। সামিরার বাবা ছাড়া আর কেউ বলবে না যে এটা পাগলের বক্তব্য।” এতদিন পরে রুবি কেন মুখ খুললেন? অভিযোগ আছে নীলা চৌধুরী তাকে প্রভাবিত করেছেন। অভিযোগগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নীলা চৌধুরী বলেন, যে আমাকে গালি দিছে, অপপ্রচার চালিয়েছে, সে এখন আমার শেল্টার চাচ্ছে। নীলার বিশ্বাস তার ছেলের হত্যাকারীরা এতদিন রুবির মুখ বন্ধ রাখতে পারলেও এখন ‘একটা কিছু’ হয়েছে, যে কারণে তিনি সব বলে দিতে চাইছেন। তার জীবনের উপর হুমকি আসছে বলেই ধারণা তার। নিরাপত্তার কারণে তিনি নিজেও দেশে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন জানিয়ে নীলা চৌধুরী বলেন, জানি না কি হবে? আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সিলেটের দাড়িয়া পাড়ায় আমার ভাই আছে। তাকেও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তার নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, মামলা পরিচালনায় দেশে যাবো কি-না জানি না। একবার মনে হয় যাই, আবার ভাবি যাবো না। তবে দেশে মামলা পরিচালানায় তার লোক আছে বলে জানান তিনি। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটন রোডে নিজের ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ শাহরিয়ার চৌধুরী ইমনের (সালমান শাহ) লাশ উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় সেই সময় অপমৃত্যু মামলা হয়। শুরু থেকেই এ নিয়ে সালমান শাহর পরিবারের জোর আপত্তি ছিল। পরবর্তীতে এ নিয়ে তার বাবা কমরুদ্দীন আহমেদ সোচ্চার হন। তার মৃত্যুর পর সেই মামলার দায়িত্ব নেন মা নীলা চৌধুরী। সালমান শাহর মৃত্যুর জন্য তার স্ত্রী সামিরা হক, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মাদ ভাইসহ ১১ জনকে দায়ী করে আদালতে আবেদন করেন নীলা। ওই ১১ জনের মধ্যে সালমান শাহর ‘বিউটিশিয়ান’ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় বসবাসরত রুবির নামও রয়েছে। বর্তমানে মামলাটি পুলিশের পিবিআই টিম তদন্ত করছে।
আমার ছেলে সে দিনের বড় সাক্ষী- রুবি: এদিকে গতকাল গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে রাবেয়া সুলতানা রুবি সাফ জানিয়েছেন ওই মামলায় সাক্ষী বা জবানবন্দি দিতে ঢাকায় আসার কোনো ইচ্ছা নেই তার। তবে পুলিশ চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে পারে। আগে প্রচারিত ভিডিও বার্তায় তিনি আদালতে সাক্ষী দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এবার সেই অবস্থান থেকে খানিক সরে গিয়ে রুবি বলেন, সাক্ষী তো আমি নই। সাক্ষী আমার ছেলে। আমার বড় ছেলে (ভিকি)। আমি তো অল্পকিছুর সাক্ষী। কিন্তু আমার ছেলে হলো  সেদিনের (সালমান শাহ্ হত্যার) ঘটনার বড় সাক্ষী। যে সামিরার দেয়া জিনিস এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে পার করেছে। ওদের বাসা থেকে আমাদের বাসার ছাদে একটা কাপড়ের পুঁটলি পাচার করেছে আমার ছেলেকে দিয়ে, যেদিন ইমন (সালমান শাহ্) মারা যায়। সামিরার কাপড়ের পুঁটলিটি আমার ছেলের হাতে দিয়েছিল পার করতে। তখন আমার ছেলের বয়স ১৭ বছর। তখন তো আমার সন্দেহ হবেই। কারণ যার স্বামী মারা যায়, আত্মহত্যা করে সে কেন একটা বাচ্চা ছেলেকে দিয়ে কাপড়ের পুঁটলি পাচার করবে? এর মানেটা কী? রুবি জানান তার ছেলে ভিকি বর্তমানে কানাডায় থাকেন। গত মাসে তিনিও সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন ভিকি তাকে অনেক কিছু বলেছেন। পরে তিনি ভিডিওটি লাইভ করেন। ভিকিই ঘটনার বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন জানিয়ে রুবি বলেন, সেই ভালোভাবে বলতে পারবে আর কী কী ঘটেছিল। আমার হাজব্যান্ড ও ভাইয়ের ব্যাপার পরে আসবে। আগে আসা উচিত সামিরা আমার  ছেলের হাতে কী জিনিস দিয়েছে- তা। রাবেয়া সুলতানা রুবি বলেন, আমি তো ভিডিও প্রকাশ করিনি। ভিডিও  তো লাইভ নেয়া হয়েছে। তবে ভিডিওতে যা বলেছি তা সত্য। এটা প্রমাণ হবে তদন্তে। সামিরাকে রিমান্ডে নিলেই সব বেরিয়ে আসবে।
পাল্টা-পাল্টি: সালমান শাহ্র মৃত্যুরহস্য নিয়ে ফের শুরু হয়েছে জল্পনা। গত সোমবার জনপ্রিয় এই চিত্রনায়কের হত্যা মামলার অন্যতম আসামি রুবি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেই ভিডিওতে সালমান হত্যাকাণ্ডের জন্য সালমানের শ্বশুরবাড়ির লোকজন ও নিজের স্বামীকে দায়ী করেন রুবি।  তিনি জানান, তিনিই সালমান হত্যার একমাত্র জীবিত প্রমাণ। এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে  দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সালমানের শ্বশুর সাবেক ক্রিকেটার শফিকুল হক হীরা জানান, রুবির বক্তব্য নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাচ্ছেন না। রুবিকে তিনি উন্মাদ আখ্যা দেন। পাশাপাশি বলেন, সালমানের মা নীলা চৌধুরী টাকা দিয়েছেন রুবিকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রুবি গতকাল মঙ্গলবার এক স্ট্যাটাসে হীরার উদ্দেশে কয়েকটি প্রশ্ন করেছেন। তিনি বলেন, ‘সামিরার (সালমানের স্ত্রী) পরিবারকে বলো আমি শরীর ও মনের দিক থেকে অনেক ভালো আছি। তারা কীভাবে প্রমাণ করবে  যে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ? সামিরার বাবা শফিকুল হক হীরা কী করে আমার সমন্ধে এত কিছু জানে?’ আরো লিখেন, ‘আমি তো উনাকে  দেখিনি ১৯৯৭ সালের পরে। আমাকে নিয়ে এত খবর তিনি কী করে জানেন? কার কাছ থেকে তিনি এত খবর পান। মাথা খারাপ মানুষ নিউ ইয়র্কে  হোটেল ভাড়া নিতে পারেন না। আমি হোটেলে তিনদিন ধরে আছি। একা। একমাত্র আল্লাহ্তায়ালার উপর ভরসা করে।’ রুবি জানান, সালমানের মায়ের সঙ্গে ১৯৯৫ সালের পর দেখা হয়নি। তার নিজের যথেষ্ট টাকা আছে। আরো প্রশ্ন  তোলেন, সালমানের মৃত্যুর দিন তার ছেলে ভিকিকে নিয়ে কিছু একটা সরিয়ে ছিলেন সামিরা।  সেটা কী? কাজের লোকের কাছে কীভাবে সালমানের সুইসাইড নোট এলো। সালমান হত্যা মামলার ১১ জন আসামির মধ্যে অন্যতম রাবেয়া সুলতানা রুবি। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়াতে চায়নিজ স্বামী ও দুই সন্তানসহ অনেকদিন ধরে বসবাস করছেন তিনি। সোমবারের পর মঙ্গলবার তার এই ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে অনেকের মনে আবারও নতুন কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
১৬ই আগস্ট সমাবেশ: সালমান শাহ্ হত্যার বিচার ও আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ১৬ই আগস্ট প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানা গেছে। সেদিনই পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা হবে। ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন ওরফে সালমান শাহ্ মাত্র চার বছরে ২৭টি সিনেমা করে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আলোড়ন তুলেছিলেন। নায়ক সালমান শাহ্র এসব সিনেমার  বেশির ভাগই ছিল আলোচিত এবং ব্যবসা সফল। তিনি এমনই এক তারকা যিনি মৃত্যুর ২১ বছর পরও রয়েছেন আলোচনায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *