কক্সবাজারে জেলা প্রশাসকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

জাতীয়

coxbazar_banglanews24_879328891কক্সবাজার: কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ২৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিনসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে এ কে এম কায়সারুল ইসলাম চৌধুরী নামে প্রকল্প এলাকার এক ব্যক্তি বাদী হয়ে কক্সবাজার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। কায়সারুল ইসলাম মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি সিকদারপাড়া এলাকার মৃত নুর আহমদ সিকদারের ছেলে।
মামলায় বাদী পক্ষের আইনজীবী সাবেক স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহমদ বাংলানিউজকে জানান, আদালতের সিনিয়র স্পেশাল জজ সাদিকুল ইসলাম তালুকদার মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে প্রেরণ করেছেন। ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালত সূত্র জানায়, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিনকে মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাফর আলম, জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আরেফিন আক্তার নুর, মহেশখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মশিউর রহমান, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিডেটের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী ইলিয়াস, জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখার প্রধান সহকারী আবুল কাশেম মজুমদার, জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কানুনগো আব্দুল কাদের, সার্ভেয়ার ফখরুল ইসলাম, বাদশা মিয়া, মাতারবাড়ির মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে রফিকুল ইসলাম ও মহিবুল ইসলাম, রফিকুল ইসলামের ছেলে আমিনুল ইসলাম, মাতারবাড়ির মাইজপাড়ার ছালেহ আহমদের ছেলে হারুন, মিয়াজী পাড়ার মৃত হাজি আলী আহমদের ছেলে জমির উদ্দিন, একই এলাকার মৃত হাজি ওয়াজ উদ্দিনের ছেলে এরফান, মৃত শফিউল আলমের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, মৃত হাজি ওয়াজ উদ্দিনের ছেলে সেলিম, মৃত হাজি আলীর ছেলে জি এ ছমি উদ্দিন, মৃত ছালেহ আহমদের ছেলে নুর আহমদ, হোয়ানক কেরুন তলীর হোসেনের ছেলে নুরুল ইসলাম, চকরিয়ার বদরখালী এলাকার মৃত হাছন আলীর ছেলে আবুল বশর, মাতারবাড়ির মৃত আবুল হোছাইনের ছেলে আশরাফ আলী, মৃত আবু ছিদ্দিকের ছেলে দানু মিয়া, মৃত জমির আহমদের ছেলে মির কাশেম, কালারমারছড়ার আনু মিয়ার ছেলে সেলিম উদ্দিন, মাতারবাড়ির বাদশা মিয়ার ছেলে রিদুয়ান, আবুল বশরের ছেলে আনিছুর রহমান এবং মৃত এলাদনের ছেলে ছকি আলম।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, দেশের এ যাবৎ কালের সর্ববৃহৎ প্রকল্প হিসেবে ঘোষিত কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প। সরকার ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কয়লাভিত্তিক এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা জাইকা এ প্রকল্পে ২৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ দেবে। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে সাত হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। বাকি তিন হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড যোগান দেবে। আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের কাজ। কিন্তু মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের অধিগ্রহণ করা চিংড়ি জমির ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়ার নামে স্বনামে-বেনামে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ২৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র।
মামলার বিবরণীতে বলা হয়, প্রধান অভিযুক্ত জেলা প্রশাসক রুহুল আমিনসহ ১ থেকে ৯ নম্বর ব্যক্তি জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এই ২৩ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তারা জড়িত। ১০ থেকে ২৮ নম্বর আসামী কোন জমি না থাকার পরও জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ২৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
এর মধ্যে মাতারবাড়ির মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে রফিকুল ইসলাম ২ কোটি ২২ লাখ ৯০ হাজার টাকা, রফিকের ভাই মহিবুল ইসলাম ১ কোটি ৯ লাখ ৭৩ হাজার ৬৯৮ টাকা, রফিকুল ইসলামের ছেলে আমিনুল ইসলাম ১ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার ১৬৭ টাকা, মাতারবাড়ির মাইজপাড়ার ছালে আহমদের ছেলে হারুন ৩৭ লাখ ৩ হাজার ৬২৩ টাকা, মিয়াজী পাড়ার মৃত হাজি আলী আহমদের ছেলে জমির উদ্দিন ২ কোটি ৪ লাখ ১ হাজার ৪৭৭ টাকা, একই এলাকার মৃত হাজি ওয়াজ উদ্দিনের ছেলে এরফান ১ কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৭ টাকা, মৃত শফিউল আলমের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ৬৮ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪১ টাকা, মৃত হাজি ওয়াজ উদ্দিনের ছেলে সেলিম ১ কোটি ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার ১৯৫ টাকা, মৃত হাজি আলীর ছেলে জিএ ছমি উদ্দিন ১ কোটি ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ টাকা, মৃত ছালেহ আহমদের ছেলে নুর আহমদ ১৪ লাখ ৪০ হাজার ২৯৭ টাকা, হোয়ানক কেরুন তলীর হোসেনের ছেলে নুরুল ইসলাম ৬৮ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪১ টাকা, চকরিয়ার বদরখালী এলাকার মৃত হাছন আলীর ছেলে আবুল বশর ৩০ লাখ ৬২০ টাকা, মাতারবাড়ির মৃত আবুল হোছাইনের ছেলে আশরাফ আলী ১ কোটি ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯২ টাকা, মৃত আবু ছিদ্দিকের ছেলে দানু মিয়া ১ কোটি ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯২ টাকা, মৃত জমির আহমদের ছেলে মির কাশেম ১ কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৭ টাকা, কালারমারছড়ার আনু মিয়ার ছেলে সেলিম উদ্দিন ১ কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৭ টাকা, মাতারবাড়ির বাদশা মিয়ার ছেলে রিদুয়ান ১ কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৭ টাকা, আবুল বশরের ছেলে আনিছুর রহমান ১ কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৭ টাকা ও মৃত এলাদনের ছেলে ছকি আলম ৩৪ লাখ ২৯ হাজার ২৮০ টাকা আত্মসাত করেছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে হরিলুট করা এই বিপুল অংকের টাকা উদ্ধারের জন্য কক্সবাজারের সার্টিফিকেট আদালতে গত ১২ অক্টোবর মহেশখালীর মাতারবাড়ী দ্বীপের ২১ জনের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা দায়েরপূর্বক টাকা ফেরত দেওয়ার নোটিশ প্রদান করে। সেই সঙ্গে জাল-জালিয়াতিতে যোগসাজসের জন্য জেলা প্রশাসনের ৪ জন কর্মচারী- ভূমি অধিগ্রহন শাখার সাবেক প্রধান সহকারী আবুল কাশেম মজুমদার, কানুনগো আবদুল কাদের. সার্ভেয়ার ফখরুল ইসলাম ও বাদশা মিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও দায়ের করা হয়। সর্বশেষ এ ঘটনার প্রধান হোতা হিসাবে অভিযুক্ত জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখার (এল এ শাখা) সাবেক প্রধান সহকারী আবুল কাশেম মজুমদারকে সাসপেন্ড (সাময়িক বহিষ্কার) করা হয়েছে।
বুধবার আদালতে জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসনের আরো আট কর্মচারীসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ২১ জনের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা হলেও দুই জনকে বাদ দিয়ে বুধবার মামলাটি দায়ের করা হয়। বাদ যাওয়া দুই জন হলেন- মহেশখালীর ধলঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আহসানুল হক বাচ্চু ও স্থানীয় রইচ উদ্দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *