বসন্ত-ভালোবাসায় একাকার গ্রন্থমেলা

Slider জাতীয়

53460_b2

 

ঢাকা; বাসন্তী রংয়ের ছটায় বর্ণিল অমর একুশে গ্রন্থমেলা। প্রবেশ দ্বার থেকে শুরু করে পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ যেন ঢাকা পড়ে হলুদ রংয়ে। বাসন্তী রংয়ের শাড়ি, কপালে লাল টিপ, হাতে কাঁচের চুড়ি, মাথায় ফুলের টায়রায় সুসজ্জিত তরুণীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল গতকালের মেলাপ্রাঙ্গণ। তরুণদের পরণে ছিল হলুদ-লাল রংয়ের পাঞ্জাবি।
ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন সকাল থেকে হাজারো মানুষের আগমন ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বকুল তলা, বটতলা, টিএসসি’র নানা আয়োজন শেষে জনস্রোত মেশে গ্রন্থমেলায়। বিকাল ৩টায় মেলার দ্বার খোলে। চলে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত। এদিন পহেলা ফাল্গুন উপলক্ষে মেলায় বইপ্রেমীদের ভিড় ছিল অনেক বেশি। বিক্রিও হয়েছে বেশ। এদিকে আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তাই এমন ভিড় আজও প্রত্যাশা করেন বিক্রেতা ও প্রকাশকরা। গতকাল মেলার ত্রয়োদশতম দিনে বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় মদনমোহন তর্কালঙ্কারের জন্মদ্বিশতবার্ষিকী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক শফিউল আলম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. সফিউদ্দিন আহমদ এবং ড. রতন সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করেন প্রাবন্ধিক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ। প্রাবন্ধিক বলেন, বাংলা সাহিত্যের বিস্মৃতপ্রায় একজন কবি, বাংলা ভাষা-ভাষী শিশুদের জন্য তিন খণ্ড ‘শিশুশিক্ষা’ প্রণয়নকারী, নারীশিক্ষার প্রবক্তা, বিধবা বিবাহের সক্রিয় সমর্থক, কুসংস্কারমুক্ত মানুষ ছিলেন মদনমোহন তর্কালঙ্কার। মদনমোহন যখন সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়নরত তার কাব্যপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে অধ্যাপকমণ্ডলী তাকে উপাধি দিয়েছিলেন ‘কবি রত্নাকর’, তার বন্ধুরা উপাধি দিয়েছিল ‘তর্কালঙ্কার’। তিনি কলকাতায় থাকতে মহাত্মা ডিরোজিওর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। প্রাবন্ধিক বলেন, মদনমোহন তর্কালঙ্কার ছিলেন আপাদমস্তক একজন মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব। আলোচকবৃন্দ বলেন, উনিশ শতকের বাংলা-রেঁনেসার সন্তান মদনমোহন তর্কালঙ্কার একজন প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন। রক্ষণশীলতা ও ধর্মান্ধতার শৃঙ্খল ভেঙে সমাজকে মুক্ত করার জন্য তিনি আত্মনিবেদন করেছিলেন। নারীশিক্ষার প্রসার ও বিধবা বিবাহ প্রচলনে অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছেন। তার জীবন ও কর্ম সমাজের অপশক্তি ও কুসংস্কার দূর করার লক্ষ্যে আমাদের ভাবী প্রজন্মকে সামনে এগিয়ে যাবার পথ দেখাবে সবসময়। সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, উনিশ শতকের প্রথম দিকে বাংলায় যে নবজাগরণের সূচনা হয় তাদের অন্যতম মদনমোহন তর্কালঙ্কার। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, সৃষ্টিশীল ও মননশীল। শিশুশিক্ষা থেকে নারীশিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা সর্বক্ষেত্রেই রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। সব মিলিয়ে তিনি একজন রেনেসাঁ-মানব। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল বেগম রাহিজা খানম ঝুনু’র পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস লি. (বাফা)’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সুবীর নন্দী, জীনাত রেহানা, দীনাত জাহান মুন্নী, অনন্যা আচার্য্য এবং সঞ্জয় কুমার দাস।
নতুন বই: গতকাল নতুন বই এসেছে ৭১টি। মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে ১৪টি বইয়ের। নতুন বইয়ের মধ্যে গল্প ৮টি, উপন্যাস ২০টি, প্রবন্ধ ৩টি, কবিতা ৩৫টি, শিশুসাহিত্য ৭টি, অনুবাদ ১টি, রম্য ১টি, রাজনীতি ১টি, ইতিহাস ১টি, ভ্রমণ ৩টি, নাটক ১টি, অন্যান্য ১৫টি।
আজকের অনুষ্ঠান: বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে পঞ্চাশ ও ষাট দশকের একুশের সংকলন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন প্রাবন্ধিক-গবেষক ড. ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন ও সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত। সভাপতিত্ব করবেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বসন্ত বরণে নানা আয়োজন: এদিকে ঋতুরাজ বসন্ত বরণে নানা আয়োজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশেপাশের এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সোমবার সকালেই শুরু হয় বসন্ত বরণের আনুষ্ঠানিকতা। ২২ বছর ধরে এ আয়োজন করে আসা জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ। শুরুতে সংগীত, তারপর দলীয় নৃত্য। আবৃত্তি, বসন্ত কথন, প্রীতিবন্ধনী বিনিময়, আবির খেলা আর দলীয় পরিবেশনায় ঋতুরাজকে বরণের আয়োজন চলে দিনভর। চারুকলার বকুলতলা থেকে বের হয় শোভাযাত্রা। বকুলতলায় বিকালে শুরু হয় বসন্তবরণ উৎসবের দ্বিতীয় পর্ব, চলে রাত পর্যন্ত। এছাড়া পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক, ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর আর উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে রবীন্দ্র সরণির উন্মুক্ত মঞ্চেও ছিল বাসন্তী আয়োজন। এদিকে নগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও বাসন্তী রংয়ে রাঙা নানা বয়সী মানুষ ঘুরে বেড়ান উৎসবের আমেজে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *