অধ্যাপক গোলাম আযমের দাফন সম্পন্ন

Slider গ্রাম বাংলা জাতীয় টপ নিউজ সারাবিশ্ব

80810_Ghulam-Azam7
গ্রাম বাংলা ডেস্ক: বায়তুল মোকাররমে অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাজার একাংশ। ছবি : আব্দুল্লাহ আল বাপ্পি
লাখো মানুষের উপস্থিতিতে আজ বাদ জোহর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হয়েছে অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাজা নামাজ। এ উপলক্ষ্যে বায়তুল মোকাররম এলাকায় মানুষের ঢল নামে। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় জাতীয় মসজিদসহ আশপাশের সব রাস্তা। জানাজা নামাজ শেষে রাজধানীর বড়মগবাজার কাজী অফিস লেনের পারিবারিক কররস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

অধ্যাপক গোলাম আযমের চতুর্থ ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী জানাজার নামাজে ইমামতি করেন।

মানুষের ঢল বায়তুল মোকাররমে
জানাজার নামাজে অংশগ্রহণের জন্য আজ সকাল থেকেই বায়তুল মোকাররম এলাকায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে থাকেন। এক পর্যায়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদ ছাপিয়ে আশপাশের সব রাস্তা কানায় কানায় ভরে ওঠে মানুষের ভিড়ে। জোহরের নামাজের আগেই পল্টন মোড় থেকে দৈনিক বাংলা মোড় এবং আশপাশের সব রাস্তা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। মানুষের ভিড়ের কারণে এক পর্যায়ে আইনশঙ্খলা বাহিনী মসিজদের আশপাশের সব রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। মসজিদের পূর্ব পাশের শাহান, দক্ষিণ পাশের প্লাজা ছাড়িয়ে মসজিদের উত্তর গেট, দক্ষিণ গেট ও পূর্ব পাশের রাস্তা এবং স্টেডিয়ামের আশপাশ সর্বত্র ছেয়ে যায় মানুষের ভিড়ে। মসজিদের ভেতরে ছিল প্রচণ্ড ঠাসাঠাসি। বায়তুল মোকারমের উত্তর গেটের সামনের রাস্তা থেকে দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয় জানজার নামাজের কাতার। দক্ষিণ পাশের বিশাল প্লাজা চত্বর ছাড়িয়ে প্রবেশপথ পর্যন্ত মানুষ কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়ায় জানাজা নামাজের জন্য।

সকাল থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের চারপাশে বিপুল সংখ্যক আইনশঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। দুপুরের দিকে দৈনিক বাংলা মোড়ে দুষ্কৃতকারীরা কয়েকটি ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করে। এছাড়া জানাজার আগে পরে পুরো এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে।

বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমের লাশ
ঠিক একটা ১৫ মিনিটের সময় অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভেতর জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থানে আনা হয়। একটি স্টিলের খাটিয়ায় করে কালিমা খচিত পতাকা মুড়িয়ে আনা হয় লাশ। মসজিদের পশ্চিম পাশের সিঁড়ি দিয়ে লাশ মসজিদের ভেতরে দোতলায় আনা হয়। সোয়া ১টায় জোহরের নামাজের পর একটা ৫০ মিনিটে জনাজার নামাজ শুরু হয়।

জানাজা নামাজের আগে অধ্যাপক গোলাম আযমের ভাগ্নিজামাই ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক মোফাজ্জল হোসাইন খান মাইকে জানাজার নামাজ বিষয়ে ঘোষণা দেন। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযমের চতুর্থ ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমী জানাজার ইমামতি করবেন।

এরপর তিনি জামায়াত নেতা অধ্যাপক মজিবর রহমানকে কিছু বলার জন্য আহবান জানান।

অধ্যাপক মজিবর রহমান বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযম সারা জীবন এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে নামাজ কায়েম হবে, যাকাত আদায় করা হবে, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অন্যায় প্রতিরোধ করা হবে। যতদিন না এসব বাস্তবায়িত হবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের এ অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।

আযমীর বক্তব্যে কান্না
অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আযমী পিতার জানাজা নামাজে ইমামতির আগে উপস্থিত লাখো মানুষের উদ্দেশে কিছু কথা বলেন। এসময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অশ্রুসজল হয়ে ওঠে মানুষের চোখ। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে।

আযমী বলেন, পৃথিবীর ক্ষণজন্মা মানুষদের একজন অধ্যাপক গোলাম আযম। ছেলে হিসেবে তার জানাজার দায়িত্ব পালনের সুযোগের জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাজার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কষ্ট করে যারা এখানে হাজির হয়েছেন তাদের সবাইকে আমি, আমার মা এবং পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনাদের মতো আমিও আজ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এখানে হাজির হয়েছি। তাই হয়ত গুছিয়ে কথা বলতে পারব না। সেজন্য আপনরা আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।

তিনি বলেন, আমার পিতাকে মিথ্যা মামলায় এক হাজার ১৬ দিন তালাবন্দি করে রাখা হয়েছে। এর প্রতিটি দিন আমার পিতার জন্য, আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের জন্য ছিল বেদনার। আমার পিতা সারা জীবন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দিন প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করে গেছেন। এটাই ছিল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আপনারা অধ্যাপক গোলাম আযমকে ভালোবাসেন না। আপনারা ভালবাসেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য একনিষ্টভাবে নিবেদিত একজন কর্মী গোলাম আযমকে। তার বিদায় মানে ইসলামী আন্দোলনের বিদায় নয়। এদেশে আরো লাখো লাখো গোলাম আযম তৈরি হবে ইনশাআল্লাহ যারা একদিন এদেশের মাটিতে ইসলামের বিজয় পতাকা ওড়াবে। তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে উপস্থিত অনেকে উচ্চস্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তাদের সবাইকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আমার পিতা কর্মজীবনে দেশের আনাচে কানাচে সফর করেছেন। অনেকের সাথে কথা বলেছেন, কাজ করেছেন। এসময় যদি তার নিজের অজান্তেও কোনোদিন কেউ কোনো কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে, দয়া করে তাকে মাফ করে দিবেন। আমার পিতাকে আল্লাহ শহীদের মর্যাদা দান করুন জান্নাতবাসী করুন।

এ সময় উপস্থিত লাখো মানুষ সমস্বরে আমিন সুম্মা আমিন বলে ওঠেন।

আযমী বলেন, তার সঠিক মূল্যায়ন সেদিন হবে যেদিন এদেশে দ্বীন বিজয়ী হবে। ইনশাআল্লাহ একদিন এদেশে দ্বীন বিজয়ী হবে। জান্নাতে যেন আমার পিতার সাথে আমার দেখা হয় সেই দোয়া আপনারা করেন।

জানাজা
সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে একটা ৫০ মিনিটে জানাজা নামাজ শুরু হয়। জানাজায় আমান আযমী যখন লম্বা সুরে আল্লাহু আকবর বলে হাত বাঁধেন তখনই মুসল্লীদের মধ্য থেকে কান্না শুরু হয়। এরপর জানাজা নামাজের শেষ পর্যায়ে আমান আযমী দোয়া পড়ার সময় মাইকে তার গলাভাঙা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। তখন অনেকে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করেন।

ককটেল আতঙ্ক
অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাজা উপলক্ষে আজ বায়তুল মোকাররম এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এতে সকালের দিকে সেখানে কিছুটা থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়।

এরপর দৈনিক বাংলা মোড়ে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরনের ঘটনা ঘটে। এতে তখন আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয় এবং অনেকে ছোটাছুটি শুরু করে।

আগত মুসল্লিরা অভিযোগ করেছেন আতঙ্ক তৈরি এবং বেশি মানুষ যাতে জানাজা নামাজে জড়ো হতে না পারেন সেজন্য পরিকল্পিতভাবে ককটেল ফুটানো হয়েছে। কে বা কারা ককটেল ফাটিয়েছে তা জানাতে পারেনি পুলিশ।

ভিসা জটিলতায় অংশ নিতে পারেননি অনেকে
অধ্যাপক গোলাম আযমের ছয় ছেলের মধ্যে পাঁচজন বিদেশে থাকেন। এদের মধ্যে চারজনই সপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। অধ্যাপক গোলাম আযমের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে তারা সবাই যুক্তরাজ্য থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে পিতার জানাজায় শরীক হওয়ার জন্য ঢাকায় আসতে চাইলেও ভিসা জটিলতার কারণে আসতে পারেন নি। ফলে চার ছেলের কেউই যুক্তরাজ্য থেকে দেশে আসতে পারেন নি। এছাড়া সৌদি আরবের জেদ্দায় বসবাসরত অধ্যাপক গোলাম আযমের বড় ছেলেও দেশে আসতে পারেন নি।

অপরদিকে অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাজায় অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে আসতে চাইলেও ভিসা জটিলতায় তারা আসতে পারেন নি বলে জানিয়েছে সূত্র।

জানাজায় উপস্থিত বিশিষ্টদের কয়েকজন
বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভেতরে জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থানে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ হাজির হন এবং লাশের পাশে কাতারবন্দি হয়ে জানাজায় অংশ নেন। এছাড়া মসজিদের ভেতরে এবং বাইরে লাখো মুসল্লির সাথেও আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জানাজার নামাজে অংশ নেন।

মসজিদের ভেতরে জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থানে জানাজার নামাজে অংশ নেন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগর আমির এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব সৈয়দ কামালউদ্দিন জাফরী, অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদিন, মোফাজ্জল হোসাইন খান, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ঢাকা মহানগর আমির মুজিবুর রহমান হামিদী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিজেপির সালাহউদ্দিন মতিন প্রকাশ, মুসলিম লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট নুরুল হক মজুমদার, মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের প্রমুখ।

সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের মধ্য থেকে জানাজার নির্ধারিত স্থানে জাতীয় প্রেস কাবের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শওকত মাহমুদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, জাতীয় প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক আবদাল আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার ও সেক্রেটারি জাহঙ্গীর আলম প্রধান প্রমুখ অংশ নেন।

এখানে জামায়াত নেতৃবৃন্দের মধ্যে অংশ নেন নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবর রহমান, নির্বহী পরিষদ সদস্য ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এটিএম মাসুম, তাসনিম আলম, ঢাকা মহনগর সেক্রেটারি সেলিম উদ্দিন, সহকারি প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ, আইনজীবীদের মধ্যে অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আবেদ রেজা, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার এহসান সিদ্দিক, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক, অ্যাডভোকেট শিশির মুহম্মদ মনির, অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহিনও জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থানে জানাজার নামাজে অংশ নেন।

লাশ বহন ও দাফন
জানাজা শেষে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কয়েকজন কেন্দ্রেীয় সভাপতি অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ বহন করে মসজিদের বাইরে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যান। তাদের মধ্যে রয়েছেন ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো: তাহের, মতিউর রহমান আকন্দ, মুজিবুর রহমান মঞ্জু, সেলিম উদ্দিন, জাহিদুর রহমান। তাদের সাথে অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমী এবং অন্যান্য লোকজনও লাশ বহনে অংশ নেন। লাশ গাড়িতে ওঠানোর পর হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেটে মগবাজার পর্যন্ত যান। তখন তা বিশাল এক শোক মিছিলে পরিণত হয়। এছাড়া দুপুরে মগবাজার থেকে লাশ গাড়িতে করে বায়তুল মোকাররমে নিয়ে আসার সময়ও হাজার হাজার মানুষ গাড়ির সাথে সাথে পায়ে হেটে মসজিদ পর্যন্ত আসেন। জানাজা নামাজ শেষে লাশ মগবাজার নিয়ে যাওয়াার পর কাজী অফিস লেনের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে সম্পন্ন হয় দাফন।

ধন্যবাদ জ্ঞাপন
অধ্যাপক গোলাম আযমের ভাগ্নিজামাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক ও একসময় বাংলাদেশ বেতারের ইসলামী অনুষ্ঠানের ভাষ্যকার মোফাজ্জল হোসাইন খান জানাজা নামাজ শেষে সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। মসজিদের মাইক থেকে তিনি জানাজায় সহায়তার জন্য পুলিশ, র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্য এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *