ট্রাম্পের অশ্লীল মন্তব্য সমালোচনার ঝড়

Slider বিচিত্র

35059_f2

 

ঢাকা; নারীদের নিয়ে অত্যন্ত নোংরা, অশালীন আর আপত্তিকর সব মন্তব্য করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। ফলাও করে বলেছেন নিজের নানা কুকীর্তি। বলেছেন, বিবাহিতা এক নারীর সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। ২০০৫ সালে ধারণ করা এক ভিডিওতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্পকে এসব মন্তব্য করতে শোনা যায়। ওই ভিডিও ফুটেজটি ফাঁস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। এর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। তিনি টিভি উপস্থাপক বিলি বুশকে বলেন, যখন আপনি একজন তারকা হয়ে যাবেন তখন নারীদের সঙ্গে যা খুুশি তা-ই করতে পারবেন। ট্রাম্প আরো বলেন, সুন্দরী নারীদের প্রতি তিনি ‘অটোমেটিক্যালি’ আকর্ষণ বোধ করেন এবং তাদেরকে চুমু দেয়া শুরু করেন। নারীদের শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গ স্পর্শ করার কথা বলতেও বাধেনি তার মুখে।
ভিডিওতে ট্রাম্পের লাগামছাড়া অশ্লীল সব মন্তব্যে হতবাক হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রবাসী। একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মুখে এসব বলতে শুনে স্তম্ভিত তারা। ডেমোক্রেটরা তো বটেই, খোদ তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারা তড়িঘড়ি করে নিন্দা জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নিন্দা জানিয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পল রায়ান। তিনিই শুক্রবার রাতে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রামেপর পক্ষে উইসকনসিনে রিপাবলিকানদের আয়োজিত ইভেন্টে আর অংশ নিচ্ছেন না।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও তার প্রচারণা শিবির। এসব মন্তব্যকে ভয়ঙ্কর আখ্যা দিয়ে হিলারি বলেছেন, ট্রাম্প নারীদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেন, তিনি নারীদের খাটো করে দেখেন এটা তারই প্রমাণ। এ কারণে তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন অনেক জাঁদরেল রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তার পরিবর্তে রিপাবলিকান দল থেকে রানিংমেট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মাইক পেন্সকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করা হোক- এমন দাবিতে তোলপাড় হচ্ছে আমেরিকার রাজনীতি। এসব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তোলপাড় চলছে। এমন অবস্থায় ডনাল্ড ট্রাম্প শিবির ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। তিনি বলেছেন, যদি আমার ওই মন্তব্যে কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন তাহলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে ওই ভিডিও টেপটি প্রচার হওয়ার পর পরই ডনাল্ড ট্রাম্প তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, ওটা লকার রুমের হাসিঠাট্টা বৈ কিছুই ছিল না। পরে অবশ্য এক সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে ক্ষমা চান তিনি। আবার এ-ও যোগ করেন, এর চেয়ে বিল ক্লিনটন নারীদের সমপর্কে আরো খারাপ কথা বলেছেন আমাকে। বিল ক্লিনটনই প্রকৃতপক্ষেই নারীদের নিপীড়ন করেছেন। তার নির্যাতনের শিকার নারীদের আক্রমণ করেছেন, লজ্জিত করেছেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন হিলারি ক্লিনটন।
ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন রিপাবলিকানরা: নারীদের নিয়ে নোংরা মন্তব্য করার কারণে নিজের দল রিপাবলিকান সিনিয়র নেতারাও তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ট্রাম্পকে নির্বাচন থেকে বাদ রাখা যায় কিনা তা নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির (আরএনসি) কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন বলেও খবর এসেছে। আরএনসি চেয়ারম্যান রেইন্স প্রাইবাস এক বিবৃতিতে বলেছেন, কোনো নারীকে কোনোদিন এভাবে এই ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। তাদেরকে নিয়ে কখনোই তার মতো এমনভাবে কথা বলা যায় না। কখনোই না। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পল রায়ানের সঙ্গে শনিবার তার নিজ অঙ্গরাজ্য উইসকনসিনে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল ডনাল্ড ট্রাম্পের। এরই মধ্যে শুক্রবার ট্রাম্পের ওই যৌনতার ভরা কথোপকথন প্রকাশ হয়ে পড়ে। এর ফলে পল রায়ান ওই অনুষ্ঠান থেকে নিজের আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেন। তিনি বলেছেন, যা শুনেছি তা গা গুলিয়ে উঠেছে। ভেতরের খবর, পল রায়ান নিজেই ট্রামপ শিবিরকে বলেছেন এমন পরিস্থিতিতে তিনি নিজ অঙ্গরাজ্যে ট্রামেপর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। পরে এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে পল রায়ান জানান, ওই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প হাজির হচ্ছেন না। রায়ানের পাশাপাশি স্থানীয় এক রিপাবলিকান সিনেটরও ওই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করেছেন। এমনকি ট্রামপ নিজেও ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না। ট্রাম্পের প্রচারণা শিবির থেকে বরা হয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মাইক পেন্স ওই সম্মেলনে ট্রামেপর ‘প্রতিনিধিত্ব করবেন’।
ওদিকে এরই মধ্যে ট্রাম্পের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন ইলিনয়ের সিনেটর ও রিপাবলিকান মার্ক কির্ক। রিপাবলিকান পার্টির কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তারা যেন অবিলম্বে তাকে (ডনাল্ড ট্রাম্পকে) বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে অন্য একজনকে প্রার্থী করার কথা বিবেচনা করে। একই রকম কথা বলেছেন, আরেক সিনিয়র রিপাবলিকান। তিনি ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্যারি হার্বার্ট। তিনি বলেছেন, এই টেপ প্রকাশ হওয়ার পর তিনি আর ট্রাম্পকে ভোট দেবেন না। ইউটাহ’র সাবেক গভর্নর জন হান্টসম্যান এক সময় রিপাবলিকান দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছিলেন। তিনিও ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে মাইক পেন্সকে মনোনয়ন দেয়ার কথা বলেছেন। ট্রাম্পের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন নিউ হ্যাম্পশায়ারের সিনেটর কেলি আয়োতি। তিনি সম্প্রতি ট্রাম্পকে শিশুদের জন্য রোল মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু টেপ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের ওই বক্তব্য পুরোপুরি বেমানান ও অশালীন। ওদিকে প্রতিনিধি পরিষদের এক রিপাবলিকান সদস্য পলিটিকো’কে বলেছেন, রিপাবলিকান দলের যেসব প্রার্থী কংগ্রেস নির্বাচন করতে চান তাদের উচিত ট্রাম্প থেকে দূরে থাকা। এর অর্থ হলো ট্রাম্পকে যদি তারা সমর্থন অব্যাহত রাখেন তাহলে কংগ্রেস নির্বাচনে তাদের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। নিন্দা জানিয়েছেন এর আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রার্থী মিট রমনী। ট্রাম্পের মন্তব্যকে সিনেটের মেজরিটি লিডার মিট ম্যাককনেল আপত্তিকর বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, এমন মন্তব্যের কারণে ডনাল্ড ট্রাম্পের উচিত প্রতিটি নারী ও বালিকার কাছে সরাসরি ক্ষমা প্রার্থনা করা। রিপাবলিকান দলের নেতা, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রার্থী জন ম্যাককেইন আগে থেকেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে আক্রমণাত্মক ও অবমাননাকর বলে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, এ অপরাধের কোন ক্ষমা হয় না। নিন্দা জানিয়েছেন ট্রামেপর সাবেক রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী জেব বুশ, মার্কো রুবিও, জন কাশিচ এমনকি টেড ক্রুজও।
কিন্তু রিপাবলিকান দলের আবার অনেকে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন। যেমন, তার সাবেক প্রচারণাবিষয়ক ম্যানেজার কোরি লিওয়ানদোস্কি স্বীকার করেছেন ট্রাম্পের মন্তব্য আক্রমণাত্মক। কিন্তু তিনি সিএনএনকে বলেছেন, আমরা কোনো স্কুলশিক্ষক নির্বাচন করছি না। আমরা এখানে একজন মুক্ত বিশ্বের নেতা নির্বাচন করছি।
ট্রাম্পের সেই অশালীন কথোপকথন
২০০৫ সালে ডনাল্ড ট্রাম্পের কথোপকথনের ভিডিও ফুটেজ হাতে আাসার পর শুক্রবার তা প্রকাশ করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। ভিডিওতে ডনাল্ড ট্রাম্পকে দেখা যায় ‘ডেজ অব আওয়ার লাইভস’ অভিনেত্রী আরিয়ানি জাকার ও ‘এক্সেস হলিউড’-এর উপস্থাপক বিলি বুশের সঙ্গে। ওয়াশিংটন পোস্টের সৌজন্যে ট্রাম্প, অভিনেত্রী আরিয়ানি ও উপস্থাপক বিলি বুশের মধ্যকার কথোপকথন এখানে তুলে ধরা হলো:
ট্রাম্প বলেন, আমি তার (ওই নারীর) দিকে অগ্রসর হলাম। কিন্তু আমি ব্যর্থ হলাম। আমি এটা স্বীকার করবো।
ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের পর আরেকটি কণ্ঠ বলেন- ওয়াও।
ট্রাম্প বলেন- আমি চেষ্টা করেছিলাম। তাকে (ওই নারীকে) …(আপত্তিকর শব্দের ব্যবহার) চেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন বিবাহিতা। আমি তার দিকে খুব বেশি আগ্রহ নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলাম। আমি তাকে ফার্নিচার কিনতে নিয়ে গিয়েছিলাম। সে কিছু ভালো ফার্নিচার কিনতে চেয়েছিলো। আমি তাকে বলেছিলাম, ভালো ফার্নিচার আছে এমন জায়গায় নিয়ে যাবো আপনাকে।
ট্রাম্প বলতে থাকেন, আমি তার দিকে ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো অগ্রসর হয়েছিলাম। কিন্তু আমি কাজটা করতে পারি নি। তিনি ছিলেন বিবাহিতা।
এরপর হঠাৎ একদিন তাকে দেখলাম। এখন তার রয়েছে বিশাল বিশাল…(অশালীন শব্দের ব্যবহার)। সে এখন তার পুরো চেহারা পাল্টে ফেলেছে।
গাড়ির ভেতর এসব কথোপকথন হচ্ছিল। তারা যাচ্ছিলেন আরিয়ানা জাকারের কাছে। আরিয়ানা এই দু’ব্যক্তিকে সোপ অপেরা সেটে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
তার কাছে পৌঁছানোর আগে ট্রাম্প বলতে থাকেন, আমি বরং আগে থেকে কিছু টিকট্যাক মুখে দিয়ে দিই, যদি আবার হঠাৎ করে তাকে চুমু খাওয়া শুরু করি। তুমি জানো, আমি স্বাভাবিকভাবেই সুন্দরীদের প্রতি আকৃষ্ট। আমি তাদেরকে চুমু দেয়া শুরু করি। এটা অনেকটা চুম্বকের মতো। শুধু চুমু। এমনকি আমি অপেক্ষাও করি না।  তিনি অব্যাহতভাবে বলে যেতে থাকেন, যখন আপনি একজন তারকা হয়ে যাবেন তারা (নারীরা) আপনাকে এটা করতে দেবে। আপনি যা চাইবেন তার সবই করতে পারবেন।
এ সময় আরেকটি কণ্ঠ, দৃশ্যত তা বিলি বুশের, বলে ওঠে- আপনি যা চাইবেন তাই।
ট্রাম্প বলেন, তাদেরকে …(অশালীন শব্দের ব্যবহার) ধরে আঁকড়ে ধরো। তুমি সবই করতে পারবে।
গাড়ি থেকে নেমে আরিয়ানা জাকারের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বিলি বুশ আরিয়ানাকে বলেন, ডনাল্ডের জন্য একটি ছোট আলিঙ্গন হয়ে গেলে কেমন হয়?
এ সময় আরিয়ান জাকার বলেন, তুমি কি একটি ছোট্ট আলিঙ্গন নিতে চাও, ডার্লিং?
জবাবে ট্রাম্প বলেন, অবশ্যই। মেলানিয়া বলেছে, এতে কোনো সমস্যা নেই।
এ পর্যায়ে ট্রাম্প, বিলি বুশ ও জাকারকে একটি স্টুডিওর ভেতর দেখা যায়।
এ ভিডিওর ব্যাপারে এনবিসি ইউনিভার্সালের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ওদিকে ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেছেন, কেউ তার মন্তব্যে আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। ওদিকে ভিডিওতে থাকা বিলি বুশ এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমি বিব্রত। লজ্জিত। এ কথোকথনের বিষয়ে কোনো অজুহাত বা ক্ষমা হয় না। এটা আসলে ১১ বছর আগে ঘটেছিল। তখন আমি ছিলাম একেবারেই তরুণ। আমার পরিপক্বতা আসে নি তখনো। বোকার মতো আচরণ করেছি। এ জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত। ওদিকে শুক্রবার বিকালেই এক ভিডিও বার্তায় ডেমোক্রেট হিলারি ক্লনটন বলেছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য ভয়াবহ। এমন মানুষকে আমরা প্রেসিডেন্ট হতে দিতে পারি না। হিলারির রানিংমেট সিনেটর টিম কেইন বলেছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য আমার হৃদয়ে আঘাত করেছে। ওদিকে হিলারিকে অনুমোদন দেয়া প্লানড প্যারেন্টহুড একশন ফান্ড-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডন লাগুয়েনসের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তাতে তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের এই ভিডিও টেপ হলো যৌন নির্যাতনের সমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *