ভোট সহিংসতায় ১০ প্রাণ গেল 

Slider জাতীয়

bj

শিশুর রক্তে রক্তাক্ত হলো ভোটের ময়দান। সন্ত্রাসীদের গুলি কেড়ে নিয়েছে নিষ্পাপ শিশু শুভর প্রাণ। ভোট কি? নির্বাচন হলে কি হয়, তাও হয়তো জানতো না শুভ। তারপরও তাকে জীবন দিতে হলো ভোটের জন্য। নির্বাচনের জন্য। দ্বিতীয় ধাপের ভোট উৎসব শুধু শুভর রক্তেই রঞ্জিত হয়নি, আরও ১০ জনকে দিতে হয়েছে প্রাণ। সংঘাত, সংঘর্ষ, ব্যালট পেপারে প্রকাশ্যে সিল, ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে। সার্বিক অবস্থায় উৎসবের বদলে নির্বাচন দেখা দিয়েছে আতঙ্ক হিসেবে।

কোথাও কোথাও প্রশাসনও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল মেরেছে। নির্বাচনে এমন প্রকাশ্য ভোট হরিলুটের ঘটনায় ভোট বর্জন করেছে প্রতিদ্বন্দ্বি অনেক প্রার্থী । অনেক কেন্দ্রে এজেন্টদের বের করে দিয়ে কেন্দ্র দখলে নিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও তার সমর্থকরা। ফলে ভোট উৎসব পরিণত হয় দখল উৎসবে। আর দখল প্রতিরোধ করতে গিয়ে সংঘর্ষ ও গুলিতে নিহত হয়েছে ১০ জন। এরমধ্যে যশোরে ৩, সন্দ্বীপে ৩, কেরানীগঞ্জে ১, মানিকগঞ্জে ১, মাদারীপুরে ১ ও জামালপুরের মেলান্দহে ১ জন। যশোরে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকায় ৫ নির্বাচনী কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে বুথে ঢুকে পুলিশ নিজেই ব্যালটে সিল মেরেছে। শেরপুরে এক মেম্বারপ্রার্থী সহ দু’জনকে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী তার বাড়িতে তালাবদ্ধ করে রাখে। পরে তাদের বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

গুলি বোমাবাজি, যশোরে নিহত ৩
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে জানান, ব্যাপক সহিংসতা, সংঘর্ষ, ভোটকেন্দ্র দখল, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গুলি আর বোমাবাজির মধ্য দিয়ে যশোর সদর উপজেলার ১৫ ইউনিয়নে নির্বাচন শেষ হয়েছে। তবে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে ৪টি ইউনিয়নের ৭টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত রয়েছে। বুধবার রাতে আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে বোমা তৈরিকালে বিস্ফোরণে দুজন নিহত, ভোটকেন্দ্রে গুলিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ভোররাতে লেবুতলা ইউনিয়নের আন্দোলপোতায় বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণে ইবাদুল হক (৩২) ও সবুজ (৩০) নামে দু’জনের মৃত্যু হয়।

বুধবার রাত ৮টার দিকে লেবুতলা ইউনিয়নের আন্দোলপোতা হাজি মতিউর রহমান ডিগ্রি কলেজের এক পাশে রুবেল, ইবাদুল, রকি, মোস্তফা, সবুজসহ কয়েকজন বোমা বানাচ্ছিল। হঠাৎ একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটলে তারা আহত হয়। এদের মধ্যে রকি, ইবাদুল ও সবুজের অবস্থা গুরুতর ছিল। নিহত ইবাদুলের বাড়ি যশোর সদরের কাঠামারি এবং সবুজের বাড়ি আন্দোলপোতা গ্রামে। ভোটের দিন আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে তারা বোমা বানাচ্ছিল বলে স্থানীয়রা জানায়।

ধানের শীষের প্রার্থী ও তার ছেলেকে মারধর: সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপশহর ইউনিয়নের এফ ব্লকের শহীদ স্মরণী স্কুল কেন্দ্রে ধানের শীষের প্রার্থী রেজাউল ইসলাম কামাল ও তার ছেলে মেহরাব ইসলামকে মারধর করা হয়। নৌকা মার্কার প্রার্থী এহসানুর রহমান লিটুর সমর্থকরা তাদের ওপর হামলা চালায়।

সহিংসতায় ফেরিওয়ালা নিহত: যশোর সদরের চাঁচড়া ইউনিয়নের ভাতুড়িয়া স্কুল কেন্দ্রে নির্বাচন চলাকালে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ-সন্ত্রাসী সংঘর্ষে আবদুস সাত্তার বিশে (৬৫) নামে এক ফেরিওয়ালা নিহত হয়েছে। তার কপালে গুলি ও শরীরের নানা স্থানে বোমার স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়। বেলা ১১টার দিকে মেম্বার প্রার্থী বিল্লালের সমর্থক সন্ত্রাসীরা গুলিবর্ষণ ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভাতুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রবেশ করে। এ সময় পুলিশও পাল্টা গুলি করে। এ সময় ফেরিওয়ালা আবদুস সাত্তার বিশের মাথায় এক রাউন্ড গুলি বিদ্ধ হয়। এছাড়া তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতও রয়েছে।

গুলিবিদ্ধ বিশেকে স্থানীয় জনতা ও পুলিশ বেলা সোয়া ১১টায় যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

যুবলীগকর্মী গুলিবিদ্ধ: সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নওয়াপাড়া ইউনিয়নের আড়পাড়া স্কুল কেন্দ্রের বাইরে দুপক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার সময় গুলিতে হাসান (৩০) নামে যুবলীগের এক কর্মী আহত হয়েছেন। তার পেট ও পিঠে তিনটি গুলি বিদ্ধ হয় বলে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান।

৭ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত: যশোর সদরের চারটি ইউনিয়নের ৭টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে তাতে সিল মারা, সিলমারা যুক্ত ব্যালট পেপার জব্দ একং ভোটকেন্দ্রে বোমাবাজি ও গুলিতে একজন নিহত হওয়ার কারণে এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। এ সময় তিনজন প্রিজাইডিং অফিসার, দুজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারসহ ৬ জন আটক হন।

৫ নির্বাচনী কর্মকর্তা আটক: জাল ভোট প্রদানে সহায়তা, কেন্দ্রের বাইরে ব্যালট পেপার পাঠিয়ে দেয়া, সিলবিহীন ব্যালট পেপার বাক্সে ভরাসহ নানা অভিযোগে ৩ জন প্রিজাইডিং অফিসার ও ২ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। আটককৃতরা হলেন বিজয়নগর স্কুল কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার রফিকুল ইসলাম ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ইশরাত জাহান, চুড়ামনকাটি স্কুল কেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার শেখ আব্দুল্লাহ বিন আকবর, চাঁচড়া ইউনিয়নের কল্যাণদহ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার রবিউল ইসলাম এবং উপশহর শহীদ স্মরণী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার তৌহিদুল ইসলাম। এই সময় জোর করে ভোট দেয়ার অভিযোগে আটক হন মহিদুল ইসলাম নামে এক পোলিং এজেন্ট। যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল হাসান, সদর ইউএনও কামরুল আরিফ, শার্শার ইউএনও আব্দুস সালাম, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আহমেমদ এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসাররা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহার: দায়িত্বে অবহেলার কারণে উপশহর ইউনিয়নের শহীদ স্মরণী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে এএসআই হুমায়ুন কবীরকে প্রত্যাহার করা হয়। কোতোয়ালি থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি জানান, এ এস আই হুমায়ুন কবীর তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় ওই কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম ও জাল বোটের ঘটনা ঘটে। যার কারনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়েছে।

কেরানীগঞ্জে গুলিতে স্কুলছাত্র নিহত
কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, কেরানীগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতায় গুলিতে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। তার নাম শুভ। সে ঢালিকান্দি মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র। সকাল ১০টায় ঢালিকান্দি এলাকায় মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

সকালে শুভ তার মা-বাবার সঙ্গে মধুরচর ভোটকেন্দ্রে যায়। এ সময় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থক রানা মোল্লার নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী অতর্কিত ভোটকেন্দ্রে হামলা চালায়। একপর্যায়ে তারা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে ভোটকেন্দ্রে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এতে শুভ গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এ ঘটনার পর ভোটকেন্দ্রটিতে বিজিবি, র‌্যাব ও ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিকে ১১টি ইউপি নির্বাচনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি ও সিল মারার অভিযোগ করে নির্বাচন বর্জন করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী। কালিন্দী ইউপি বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী সামসুল হক লিটন কালিন্দী পারজোয়ার উচ্চ বিদ্যালয়ে গেলে এ সময় আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাকে কেন্দ্র থেকে বের দেয় এবং সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয়। এ সময় সাংবাকিদের সামনে তিনি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

গোপালগঞ্জে সংঘর্ষে আহত ১৫
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের দুর্গাপুর ভোটকেন্দ্রে ভোট ভাগাভাগি নিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী টিকে মুন্সি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুল হুদা মিটুলের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে টিকে মুন্সির সমর্থক রিয়াজুল, সজীব, মনির, রাজিব, ইকলাস, কালু, হাফিজুর, করিম মীনাসহ উভয় গ্রুপের কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। গতকাল দুপুর একটায় এ ঘটনা ঘটে।

কুমিল্লায় ৭ প্রার্থীর ভোট বর্জন
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, সংঘর্ষ, গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ, ধাওয়া-পালটা ধাওয়া, বিএনপির এজেন্টদের বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে কেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ ও বরুড়া উপজেলার ১৪টি ইউপির নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বেলা আড়াইটায় এসব অভিযোগ এনে সদর দক্ষিণ উপজেলার ৫টি ইউপির বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জন করেছেন। অপরদিকে ভোট চলাকালে কেন্দ্র দখলসহ সংঘর্ষের ঘটনায় জেলার বরুড়া উপজেলার চিতড্ডা ইউপির মুকুন্দপুর ও ভঙ্গুয়া কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করেছেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার। দু-ইউনিয়নে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। ভোট চলাকালে সকাল ৯টার দিকে কালিকাপুর কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মীরা হকিস্টিক, লাঠিসোটা নিয়ে বিএনপি কর্মীদের ধাওয়া করে। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও ফাঁকা গুলি চালায়। দুপুরের আগেই ওই উপজেলার সবকটি কেন্দ্র দখলে নেয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। বিকাল আড়াইটার দিকে এ উপজেলার ৫ ইউপির বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন বর্জন করেছেন। নির্বাচন বর্জনকারীরা হচ্ছেন- পেরুল দক্ষিণ ইউপির মাসুদ করিম, চৌয়ারা ইউপির ইসমাইল হোসেন মজুমদার, বারপাড়া ইউপির মোস্তফা কামাল, পশ্চিম জোড় কাননে মোস্তফা মারশেদ চৌধুরী এবং পূর্ব জোড়কাননে শাহনেওয়াজ। এ ছাড়া দুপুরে এ উপজেলার চৌয়ারা ইউপির আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এটিএম ইদ্রিস ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা নূর হোসেন পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জন করেছেন।

লালপুরে ৪টি ইউনিয়নে বিএনপির ভোট বর্জন
নাটোর ও লালপুর প্রতিনিধি জানান, নাটোরের লালপুরে এক বিএনপি মনোনীত ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীর গাড়ি ভাংচুর, দুই ইউপি সদস্যের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ কর্মীদের হামলায় বিএনপিকর্মী-সমর্থকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। অপরদিকে বাগাতিপাড়া উপজেলার পাকা ইউনিয়নে একটি কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে ভোটে কারচুপি, জোর করে ভোট প্রদান, প্রার্থীদের নিরাপদে চলাচল করতে না দেয়া এবং বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে আসতে না দেয়ায় ৪টি ইউনিয়নে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। এদিকে ২নং ঈশ্বরদী ইউনিয়নের নুরুল্লাহপুর কেন্দ্রে সাংবাদিকদের কাছে জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে সিল মারার অভিযোগ করায় এক ভোটারকে মারপিট করে আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান প্রার্থী আমিনুল ইসলাম জয়ের সমর্থকরা। পরে সাংবাদিকদের গাড়িতে করে ওই ভোটারকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানো হয়। এদিকে ব্যালট পেপার ছিনতাই ও প্রিজাইডিং অফিসারকে মারপিট করায় এবি ইউনিয়নের শ্রীরামগাড়ি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে প্রশাসন।

মীরসরাইয়ে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া
মীরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, মীরসরাই উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত  চাপা উত্তেজনা ও বিক্ষিপ্ত ধাওয়া-পালটা ধাওয়াসহ বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে কিছু কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের এজেন্টগণ বলেন ওরা নিজেরাই চলে গেছে। কেউ ওদের কিছু বলেনি বা বাধা দেয়নি।

এ সময় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মেম্বার প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও বিভিন্ন স্থানে বিএনপি কর্মীদের উপর হামলায় অন্তত ২০ কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের এজেন্ট বের করে দেয়া ও ভোটারদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, জাল ভোট প্রদান এবং ধানের শীষ সমর্থিত ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগ করেছে বিএনপি।

ভুরুঙ্গামারীতে এক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ
স্টাফ রিপোর্টার, কুড়িগ্রাম থেকে জানান, ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব কেদার দাখিল মাদরাসা কেন্দ্রের বাইরে দু’মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের কথাকাটাকাটির জটলা ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ এক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে ভোট গ্রহণে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি হয়নি। জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন জানান, দুপুর সোয়া ২টার দিকে ভোট কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় মেম্বার প্রার্থীদের জটলা ভোট কেন্দ্রে প্রভাব ফেলতে পারে এ আশঙ্কায় পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। তবে এতে কেউ আহত হয়নি।

বাজিতপুরে বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন
বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, বাজিতপুর পুরাতন কৈলাগ ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রের ৩০০ ব্যালট পেপার ছিনতাই হওয়ায় ওই কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। স্থগিত হওয়া ভোট কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা ৭৫০টি এবং বুথ রয়েছে ৩টি। এ ছাড়া কৈলাগ ইউনিয়নের বিএনপির চেয়াম্যান প্রার্থী মোহাম্মদ আলী নির্বাচন বর্জন করেছেন। তিনি তার অভিযোগে উল্লেখ করেন, তার দলের এজেন্টদেরকে সরকারদলীয় সমর্থকরা বের করে দেয়ার কারণে তিনি নির্বাচন বর্জন করেন। এদিকে মাইজচর ইউনিয়নের পারকচুয়া নির্বাচন কেন্দ্রের অদূরে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ চেয়াম্যান প্রার্থী সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া-পালটা ধাওয়ায় অন্তত ৮জন আহত হয়েছে।

শেরপুরে তালা ভেঙে মেম্বার প্রার্থীকে উদ্ধার
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, শ্রীবরদী সদর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুল হালিম ডাক্তারের নেতৃত্বে সন্ত্রাস ও ভোট ডাকাতির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তার বসতঘর থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় মো. সুজা উদ্দিন (৬০) নামে এক মেম্বার প্রার্থী ও তার কর্মী খোকা মিয়া (৫৮) কে উদ্ধার করেছেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। নয়ানী শ্রীবরদী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য সকাল ১০টার দিকে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. মুরাদুজ্জামান ও মেম্বার প্রার্থী সুজাউদ্দিনের সমর্থকদের দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও তার সমর্থকরা। একপর্যায়ে তারা মেম্বার প্রার্থী সুজাউদ্দিন ও তার কর্মী খোকা মিয়াকে বসতবাড়িতে নিয়ে ঘরের দরজা তালাবদ্ধ করে রাখে। খবর পেয়ে দুপুর ১২টায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুমিনুন্নেছার নেতৃত্বে নির্বাচনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টিম ওই বাড়িতে গিয়ে তালা ভেঙে তাদের দুজনকে উদ্ধার করে। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুমিনুন্নেছা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ওদিকে নকলা উপজেলার উরফা ইউনিয়নে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী রুস্তম আলী। বেলা ১১টার দিকে তিনি ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জোরপূর্বক ভোট কারচুপি করছে বলে অভিযোগ করেন রুস্তম আলী।

শ্রীনগরে পুলিশের গুলি
শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, শ্রীনগরে ১৪টি ইউনিয়নে নির্বাচনে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা, ব্যালট পেপার ছিনতাই, ককটেল বিস্ফোরণ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে  কয়েকটি কেন্দ্রে সাময়িক ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়। কেন্দ্র দখলকে ঘিরে পুলিশের গুলিতে একজন ও ককটেল বিস্ফোরণে ৩ জন আহত হয়েছে। এছাড়া  দুই আনসার সদস্য সহ অন্তত আরও ২০ জন আহত হয়েছে। দুপুর একটার দিকে পাটাভোগ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ প্রার্থী ফিরোজ আল মামুনের সমর্থকরা মাসুরগাঁও কেন্দ্রে পর পর কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে আলামিন (২৫) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়। এর আগে কুকুটিয়া ইউনিয়নের নাগরভাগ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন ককটেল ফাটিয়ে কেন্দ্রটি দখলের চেষ্টা করে। এসময় ককটেল বিস্ফোরণে মো. ফিরোজ শেখ (৪০) নামে একজন আহত হয়। পরে বিজিবি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও দুপুর দুইটার দিকে ব্যালট পেপার, সিল ও প্যাড কেন্দ্রের বাইরে নিয়ে তাতে শিল মেরে বাক্স ভরা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধী পক্ষের এজেন্টরা।

ভূঞাপুরে সংঘর্ষ গুলি, আটক ১৬
ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, কেন্দ্র দখল, সংঘর্ষ, গুলি ও জাল ভোট দেয়ার মধ্য দিয়ে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের ৬টি ইউনিয়নের ভোট গ্রহণ শেষ হয়। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে অলোয়া ইউনিয়নের ভারই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ইউপি সদস্য প্রার্থী মকবুল হোসেন ব্যালট পেপার নিয়ে দৌড় দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পুলিশ ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনে। এসময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হামিদ ভোলা, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পলাশ ও ইউপি সদস্য প্রার্থী মকবুল হোসেনকে আটক করা হয়। এর আগে সকাল থেকেই ফলদা ইউনিয়নের মাইজবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মমিনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আগতেরিল্ল্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৫টি কেন্দ্র বিএনপি প্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলুর ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয় এবং ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা প্রদান করা হয়। পরে ওই কেন্দ্রগুলোতে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ করেন বিএনপি প্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলু। দুপুর আড়াইটার দিকে নিকরাইল ইউনিয়নের সিরাজকান্দি দাখিল মাদরাসা কেন্দ্রে দুই মেম্বার প্রার্থী মোন্নাফ আলী ও ইয়ার আলীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে বিজিবি ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নবীনগরে সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ
নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, নবীনগরে সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের রাবার বুলেট নিক্ষেপ, ধাওয়া পালটা ধাওয়ার মধ্য দিয়ে ১১ ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে  ৩ জন গুলিবিদ্ধসহ ২৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইব্রাহিমপুর ইউপির  বাছিতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লাওর ফতেপুর ইউপির  হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও টানচারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নবীনগর পূর্ব ইউপির  নায়েব আলী শাহ্‌ আস্তানা ক্যাম্পে  সংঘর্ষ ও  ধাওয়া পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ইব্রাহিমপুর ইউপির বাছিতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ থামাতে পুলিশের গুলিতে ইউনুস মিয়া (৫৯), রিনা খন্দকার (৪১), আবুল কাশেম (৫৯) আহত হয়।

গাজীপুরে নির্বাচন বর্জন
স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর থেকে জানান, কালীগঞ্জ উপজেলায় নির্বাচনে জালভোট, এজেন্টদের বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল, নেতাকর্মীদের মারধর ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এনে চার ইউনিয়নে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। দুপুরে নিজ নিজ এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে বর্জনের এ ঘোষণা দেন জাঙ্গালীয়া ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী নেছার উদ্দিন নূহ, জামালপুর ইউনিয়নে হারুন অর রশিদ দেওয়ান, মোক্তারপুর ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম পালোয়ান এবং বাহাদুরশাদী ইউনিয়নে এসএম জয়নাল আবেদীন শেখ ও জামালপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী খাইরুল আলম। নির্বাচন বর্জনকারী জামালপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী খাইরুল আলম অভিযোগে বলেন, নির্বাচন শুরুর দুই ঘণ্টার মধ্যে গোলারটেক শাহিদা মোল্লা বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র এবং কলাপাটুয়া কেন্দ্রের সামনে তার আপন ভাই বাদল মোড়লসহ কর্মী-সমর্থকদের ওপর দফায় দফায় হামলা করেছে প্রতিপক্ষ সরকারদলীয় লোকজন। এতে তাদের ৮-১০ আহত হয়েছে। তার এজেন্টদের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মেরেছে নৌকার লোকজন। তার স্ত্রী নাজমা বেগম জামালপুর কলেজ কেন্দ্রে এজেন্ট ছিলেন। তাকেও নানা হুমকি দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।

বগুড়ায় ককটেল হামলা
বগুড়া থেকে সংবাদদাতা জানান, শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর ইউনিয়নে ভোট গণনাকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মিরা ককটেল হামলা করেছে। এ সময় পুলিশ ৩টি তাজা ককটেলসহ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ইউপি মেম্বার প্রার্থী ইউনুছ আলীকে (৫০) গ্রেপ্তার করেছে। জানা গেছে, উপজেলার রায়নগর ইউনিয়নের সেকেন্দ্রারাবাদ দাখিল মাদরাসা কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে বাইরে থেকে ভোটকেন্দ্র লক্ষ্য করে পর পর তিনটি ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পাবনার ফরিদপুর ও ভাঙ্গুড়ায় ককটেলসহ আটক ৫
স্টাফ রিপোর্টার, পাবনা থেকে জানান, জোরপূর্বক ব্যালট পেপারে সিলমারা এবং ধাওয়া পালটা ধাওয়ার মধ্য দিয়ে পাবনার ফরিদপুর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে থেকে ককটেলসহ ৫ যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া জোরপূর্বক নৌকা প্রতীকে ডেমরা ইউনিয়নে ভোট প্রদানে বাধা দেয়ায় বিএনপির সমর্থকদের সঙ্গে ধাওয়া পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৫ জন বিএনপি কর্মী আহত হয়েছে। এছাড়া পার ভাঙ্গুড়ার পাথরঘাটা কেন্দ্রে ধানের শীষের কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি। রাতে ভাঙ্গুড়ার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ভোটারদেরকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বারণ করা হয়েছে। এদিকে ভাঙ্গুড়া উপজেলার দিলপাশার ইউনিয়নের দিলপাশার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের বাইরে থেকে ককটেলসহ ৫ জনকে  আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সিরাজগঞ্জে পুলিশের গুলিবর্ষণে আহত ২৩
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জালভোট, ব্যালট ছিনতাই, কেন্দ্র দখল, প্রার্থীদের সমর্থকদের সংঘর্ষ, পুলিশের গুলিবর্ষণ, সাময়িক বন্ধ, স্থগিতসহ বিক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে সিরাজগঞ্জের ৯টি ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলার কাওয়াকোলা, মেছড়া, খোকশাবাড়ি ও বহুলী ইউনিয়নের বেশক’টি কেন্দ্রে ব্যালট ছিনতাই ও জালভোট প্রদানকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড শটগানের গুলি ছুড়েছে। এসব ঘটনায় ৩০ জন গুলিবিদ্ধসহ কমপক্ষে অর্ধশত আহত এবং ১০ জন পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ ২৩ জনকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সীতাকুণ্ড ভোট ডাকাতির মহোৎসব
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, সীতাকুণ্ড সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। উপজেলার ১নং থেকে ১০নং ইউপির ৮৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৮৫টি ভোটকেন্দ্রই ৯টার মধ্যে দখল করে নেয় সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩টি ওয়ার্ড ভোটকেন্দ্র ছাড়া বাকি ৮৫টি ভোটকেন্দ্র বুধবার রাত থেকেই দখল করে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে রেখেছে বলে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা অভিযোগ করেন। তা ছাড়া সকালে বিএনপি সমর্থিত ধানের শীষের প্রার্থীদের কোনো এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। ৮৫টি কেন্দ্রে বিএনপির কোনো এজেন্ট না থাকায় সরকারদলীয় কর্মীরা ও কোথাও কোথাও প্রিজাইডিং অফিসাররা চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যালট পেপারগুলোতে নৌকা প্রতীকের সিল মেরে রাখে।

মেলান্দহে নিহত ১
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, জালভোট প্রদান ও ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার মধ্য দিয়ে জামালপুরের দুই উপজেলায় ২৫টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের অভিযোগে সকালে মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের মামা-ভগনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ৬ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এ সময় এ কেন্দ্রটির ভোট গ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করা হয়। একই কারণে এ উপজেলার চরবানী পাকুরিয়া রায়ের বাকাই উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোট গ্রহণও স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ মেলান্দহ উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নে আবদুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৩ রাউন্ড, নয়ানগর ইউনিয়নের মালঞ্চ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৫ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। নির্বাচন চলাকালে এ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের উত্তর বালুর চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই মেম্বার প্রার্থী মোকছেদ আলী ও মর্জিনা বেগমের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে রফিকুল ইসলাম (৫২) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন।

মাদারীপুরে পুলিশের গুলিতে একজন নিহত
মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, মাদারীপুরে নির্বাচনী সহিংসতায় পুলিশের গুলিতে এক যুবক নিহত হয়েছে। নিহতের নাম সুজন মৃধা। গতকাল সন্ধ্যায় সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নে দক্ষিণ বীরাঙ্গল গ্রামে সংঘর্ষের সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের বীরাঙ্গল গ্রামের বাচ্চু মৃধার পুত্র সুজন মৃধা নিহত হয়। নিহত পিতা বাচ্চু মৃধা বলেন, আমার ছেলেকে এএসআই এনামুল গুলি করে হত্যা করেছেন। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন জানান, সংঘর্ষের সময় কোনো পক্ষের গুলিতে নিহত হয়েছে তা আমি জানি না। তবে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি গুলি ছুড়ছে কি না তদন্তের পর জানা যাবে।

চাঁদপুর সদর ও হাইমচরে ১৪ চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচন বয়কট
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, অনিয়মের অভিযোগে কয়েকটি কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত ও প্রার্থীরা নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন। চাঁদপুর সদরের ১২টি ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ১১ চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির ৬ প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন চাঁদপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামছুল ইসলাম মন্টু পাটোয়ারী। এ সময় বিএনপির চারজন ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া তরপুরচণ্ডী ইউনিয়নের ৩ প্রার্থী নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন। তারা হচ্ছেন স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মুজিব কাজী, ইসলামী আন্দোলনের চেয়ারম্যান প্রার্থী মারুফ ও বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী সরদার রফিকুল ইসলাম। আশিকাটি ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলওয়ার মাস্টার, বাগাদী ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী মোহাম্মদ আলী পাঠান। এ ছাড়া চাঁদপুর সদর উপজেলার কল্যাণপুর ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল আলম খান, জাকির হোসেন তালুকদার, ইসলামী আন্দোলনের জামিল আহমেদ, চান্দ্রা ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহজাহান খান ও রামপুর ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী জাকির হোসেন তালুকদার। বাগাদী ইউনিয়নে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান প্রার্থী জাহাঙ্গীর গাজী, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছিরউদ্দিন খান নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন। এদিকে হাইমচরে ভৈরবী আজিজিয়া মাদরাসা কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার কে এম মান্নাতকে মারধর করে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগে ওই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

ভোলায় সাংবাদিকসহ গুলিবিদ্ধ ৭
ভোলা প্রতিনিধি জানান, প্রার্থীদের ভোট বর্জন, কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার নিয়ে মেম্বার প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের মধ্যদিয়ে ভোলার ৪টি উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দিনভর সংঘর্ষে ও গোলাগুলিতে অন্তত শতাধিক লোক আহত হয়েছে। দুপুরের দিকে সদরের রাজাপুর ও পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নে পৃথক কয়েকটি সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে পুলিশের মিস ফায়ারে এনটিভি প্রতিনিধি আফজাল হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজাপুর ৪নং ভোট কেন্দ্রে পেশাগত দায়িত্বপালন করতে গিয়ে পুলিশের শটগানের গুলিতে আহত হন সাংবাদিক আফজাল হোসেন। এ ছাড়াও রাজাপুর ৮, ৫ ও ৬ এবং ইলিশা ৫  নাম্বার ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও বিক্ষুব্ধ সংঘর্ষের ঘটনায় ৩০ জন আহত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *