৩ দিনেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ঘরবাড়ি হারা পরিবারগুলো

Slider জাতীয়


ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ে ঘরবাড়ি হারা ভোলার কয়েকশ পরিবার চরম দুর্ভোগে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঘরহারা অধিকাংশেরই অস্থায়ী ঠিকানা হয়েছেন অন্যের বাড়িতে। আবার সামর্থবানদের কেউ কেউ ভাঙা ঘর জোড়াতালি দিয়ে থাকার জন্য প্রস্তুত করতে দেখা গেছে। এদিকে তিন দিনেও চরফ্যাশনে দুর্গত এলাকায় কোনো ধরনের সহায়তা না পৌঁছায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
৩ দিনেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ঘরবাড়ি হারা পরিবারগুলো

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী জেলায় বিধ্বস্ত হয়েছে ৭ হাজার ৯২২টি ঘরবাড়ি। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ২ হাজার ২৮৩টি, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ হাজার ৬৩৯টি। এছাড়াও ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছাসে জেলায় ছয় হাজার ২৮০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর ফসলী জমি। ৩দিনেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি জেলার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি।

সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ঘরবাড়ির মধ্যে মধ্যে সদর উপজেলায় ১৬০টি, দৌলতখানে ৫১টি, বোরহানউদ্দিনে ৪২০টি, তজুমদ্দিনে ৫০০টি, লালমোহনে ৩৫০টি, চরফ্যাশনে ৫০২টি ও মনপুরায় ৩০০টি। জেলায় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁচ হাজার ৬৩৯টি ঘরবাড়ি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫৫০টি, দৌলতখানে ২৬৯টি, বোরহানউদ্দিনে এক হাজার ৩৫০টি, তজুমদ্দিনে এক হাজারটি, লালমোহনে ৭০০টি, চরফ্যাশনে এক হাজার ২৭০টি ও মনপুরায় ৫০০টি।

ভোলা জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ে জেলায় মোট ৬ হাজার ২৮০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হাজার ৪০০টি, দৌলতখানে ৬২০টি, বোরহানউদ্দিনে ৪৯০টি, তজুমদ্দিনে ৭৮৮টি, লালমোহনে ৯২২টি, চরফ্যাশনে এক হাজার ৩৪০টি ও মনপুরায় ৭২০টি।

ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তাৎক্ষণিক ৮৪ মেট্রিকটন চাল এবং নগদ ৩ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হবে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চরফ্যাশন উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, তাৎক্ষণিক ২০ মে. টন চাল বরাদ্দ দেওয়ার হয়েছে। শিগগিরই এসব চাল বিতরণ করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল নোমান জানান, গৃহহীনদের পুনর্বাসনে সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে।

সরেজমিনে হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের আলম ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঢালে ৩দিন ধরে গাছ চাপায় পড়ে আছে ৭০ বছরের বৃদ্ধ মো. ছালাউদ্দিন ও তার ছেলে সাহাবুদ্দিনের ২টি ঘর। অর্থ সংকটের কারণে গাছ সরাতে পারেনি। ঘর থেকে কোন মালামালও বের করতে পারছে। নিরুপায় হয়ে ২ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশীর ঘরে। কিন্তু কবে চাপা পড়া গাছ সরিয়ে নিজের ঘরে বসবাস শুরু করতে পারবে তা জানা নেই সালাউদ্দিন পরিবারের। গাছ সরিয়ে তার ঘরটি পুনর্নির্মাণের জন্য সরকারের সহায়তা চেয়েছেন তিনি।

ওই এলাকার সজিব নামের আরেক জেলের ঘর একইভাবে গাছের নিচে চাপা পড়ে আছে। গাছ সরাতে না পেরে বাবার ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সজিবের পরিবার। একই ইউনিয়নের গাছুর গাছিয়া এলাকার গিয়ে দেখা যায় চাল বেড়া উড়ে যাওয়া কয়েকটি ঘর মেরামত করে বসবাসের উপযোগী করছেন কয়েক পরিবার। গাছুর গাছিয়া মাছঘাটের জেলে মো. হাসানের পুরো ঘরটি উড়িয়ে নিয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। কিছু কাঠ ছাড়া সবই ভেসে যায় জোয়ারের পানি আর দমকা হাওয়ায়। স্ত্রী ও শিশু ছেলেকে নিয়ে অদূরে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন মো. হাসান। মাছ ধরাও বন্ধ ২২ দিন। বেকার থাকায় চরম অর্থ সংকটের মধ্যে ঘর তোলার কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছেনা তিনি।

বুধবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ১০ টায় সরেজমিনে দেখা যায় স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে শূন্য ভিটায় বসে আসেন তিনি। হাসান জানায়, দিনের বেলায় শূন্য ভিটা পাহারা দেন আর রাতে গিয়ে বাবা নান্নু মাঝির বাসায় থাকেন। দরিদ্র বাবার পক্ষে তার পরিবারে ভরণপোষণও সম্ভব না। কবে নাগাদ আবার তার মাথার উপর চাল উঠবে সেটা জানেন না তরুণ জেলে হাসান। দুর্গত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত সবাই কোনো সহায়তা না পাওয়া ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *