দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কর্মপন্থা

লাইফস্টাইল

হজরত ইউসুফ (আ.) তখন মিসরের জেলে বন্দি। মিসরের বাদশাহ এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্ন দেখার পরে ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান বাদশাহ। রাজ্যের সভাসদ-বুদ্ধিজীবীদের কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাইলেন। তারা বললেন, ‘নিতান্ত কল্পনাপ্রসূত স্বপ্ন।’ তাদের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তারা ‘অলীক স্বপ্ন’ বলে এড়িয়ে যায়। বাদশাহর একজন সেবক তখন হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কথা বলেন।

পরে ইউসুফ (আ.)-এর কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাওয়ায়, তিনি এর ব্যাখ্যা প্রদান করলেন। তার ব্যাখ্যায় বাদশাহর পছন্দ হয় এবং তাকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন। সেই সংকটকালে ইউসুফ (আ.) যে অনুপম দক্ষতায় পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন, তা আমাদের জন্য শিক্ষার।

কোরআনের ভাষায়, ‘বাদশাহ বলল, আমি স্বপ্নে দেখেছি সাতটি মোটা গাভীকে সাতটি জীর্ণ-শীর্ণ গাভী খেয়ে ফেলেছে এবং দেখেছি সাতটি শীষ সবুজ সাতটি শীষ শুকনো।’ দুজন কারাবন্দির মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল দীর্ঘ সময় পর তার ইউসুফ (আ.)-এর কথা মনে পড়ল। সে বলল, আমি আপনাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দেব। আমাকে কারাগারে যাওয়ার সুযোগ দিন। কারাগারে এসে সে বলল, হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী! মিসরের বাদশাহ একটি স্বপ্ন দেখেছেন। আমাকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও যাতে করে আমি মানুষকে জানাতে পারি।

ইউসুফ (আ.) বললেন, তোমরা সাত বছর লাগাতার চাষাবাদ করবে, তারপর তোমরা যে শষ্য সংগ্রহ করবে তার মধ্য থেকে যা তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শষ্য তোমরা শীষসহ সংগ্রহ করবে। তারপর আসবে সাতটি কঠিন দুর্ভিক্ষের বছর। এই সাত বছরে লোকেরা যা সঞ্চয় করে রেখেছে কেবল তাই খাবে। এ ছাড়া আর কোনো ফসল উৎপন্ন হবে না।

স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে বাদশাহ বলল, ইউসুফকে নিয়ে এসো, আমি তাকে আমার একান্ত সহচর হিসেবে নিয়োগ করব। ইউসুফকে দেখে বাদশাহ বলল, আজ তুমি আমাদের কাছে মর্যাদাবান ও বিশ্বাসভাজন মানুষে পরিণত হয়েছ। ইউসুফ (আ.)-কে মিসরের দেশের ধন-সম্পদের দায়িত্ব দেওয়া হলো এবং তিনি বিশ্বস্ত ও সুবিজ্ঞ হয়ে দায়িত্ব পালন করলেন। এভাবেই ইউসুফকে আল্লাহ সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলেন।

দুর্ভিক্ষের সময় ইউসুফের ভাইয়েরা খাদ্য নিতে এলো। ইউসুফ তাদের চিনতে পারলেন। কিন্তু ভাইয়েরা তাকে চিনতে পারল না। যখন ইউসুফ তাদেরকে খাদ্য বণ্টন করে দিলেন তখন সে বলল, তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না- আমি মাপে পূর্ণ মাত্রায় দিই। অর্থাৎ আমার মাঝে স্বজনপ্রীতি কিংবা চুরির দোষ নেই। (সূরা- ইউসুফ)

হজরত ইউসুফ (আ.)-এর এ ঘটনার মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় যে জরুরি বিষয়গুলো আল্লাহতায়ালা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন—

১. কৃষি ও খাদ্য বিভাগের দায়িত্বশীলকে অবশ্যই খাদ্য ও ফসল উৎপাদন বিদ্যায় পারদর্শী এবং সুষম বণ্টনে অভিজ্ঞ হতে হবে।

২. তাকে অবশ্যই শতভাগ আমানতদার হতে হবে।

৩. খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিজ্ঞান সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকা চাই।

৪. জনগণের বাস্তব অবস্থার সঠিক তথ্য এবং পরিসংখ্যান জানতে হবে।

৫. প্রয়োজনমতো খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৬. স্বজনপ্রীতি ও প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে থেকে সমবণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।

৭. জনগণের সামর্থ্যানুযায়ী বিনিময় মূল্য গ্রহণ করে এবং সামর্থ্যহীনদের বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।

৮. দুর্ভিক্ষকবলিত জনগণের প্রতি অনুগ্রহ নয় বরং অধিকার হিসেবে আপদকালে তাদের খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।

৯. ব্যবস্থা এমন হতে হবে যেন মানুষ সরকারি ত্রাণ সম্মানের সঙ্গে নিতে পারে।

১০. এ বিভাগের কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় ভাতা ও সুরক্ষার নিশ্চিত করতে হবে।

১১. সব কাজ তাকওয়ার ভিত্তিতে এবং সততার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।

১২. সবসময় মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও ভরসা রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *