সাত খুনের মামলা ডিপফ্রিজে যাওয়ার শঙ্কা

Slider বাংলার আদালত

313605_138

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্স র‌্যাব। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল অপহরণের ঘটনার পর র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত বছরের ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জের জজ কোর্ট ও পরে হাইকোর্টেও রায় ঘোষণা করা হয়।

এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতেও প্রধান আসামী নূর হোসেন ও র‌্যাবের তিন কর্মকর্তা সহ ১৫ জনের মৃত্যদন্ড বহাল রেখেছে। হত্যকান্ডের শিকার সাত জন হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার, নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মোঃ ইব্রাহীম।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি এ মামলায় ২৬ জনের মৃত্যুদন্ড আর নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দিয়ে রায় ঘোষণা করেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত। কারাগারে থাকা মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে অপিল করেন। এর প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট হাইকোট ১৫ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে বাকি ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়। তাদের ২০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়। অন্যদায়ে আরো দুই বছরের সাজা ভোগ করার নির্দেশ দেন। এছাড়া নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-ের রায় হাইকোর্টও বহাল রয়েছে।

সাত খুনে নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘আমার প্রত্যাশা দ্রুত রায়ের কার্যকর হবে। এখন ভালো আছি। আরো ভালো থাকবো যদি রায় কার্যকর হয়। মামলা চলাকালে আমাকে অনেকেই হুমকি দিত। কিন্তু এখন আর তেমন কেউ হুমকি দেয় না।’

নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের ভাই রিপন বলেন, ‘এখনও রায় কার্যকর না হওয়ায় আমাদের ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে শংকা কাজ করে যে সরকারের ৫ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু রায় কার্যকর হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি দ্রুত এ রায় কার্যকর করা হোক। নির্বাচনের আগেই রায় কার্যকর করা হোক। এ রায়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক যে আর যেন কোন নূর হোসেনের সৃষ্টি না হয়।’

জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নুপুর বলেন, ‘সামনে নির্বাচন আমি চাই এ নির্বাচনের আগেই যেন এ রায় কার্যকর হয়। এ সরকার থাকতেই যাতে এ খুনীদের শাস্তি কার্যকর হয়।’

তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেছেন, যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তারা নরপশুর চেয়ে খারাপ। দেশের কাছে, প্রশাসনের কাছে ও বিচার বিভাগের কাছে দাবি থাকবে খুব দ্রুত রায় কার্যকর করা হোক। মৃত্যুর আগে সন্তান হত্যার বিষয়টি আমি কখনো ভুলতে পারবো না। আমার সন্তান হারানোর বেদনা আমিই বুঝি।

বাদী পক্ষের আইনজীবী নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আমরা মনে করেছিলাম এ মামলা দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি হবে। সাবেক প্রধান বিচারপতি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন দ্রুত পেপার বুক তৈরি করে দ্রুত শুনানী করে দ্রুত রায় কার্যকর করা হবে। তবে বর্তমানে মনে হয় মামলাটি ডিফ ফ্রিজে চলে গেছে। এখনও পর্যন্ত পেপার বুক তৈরি হয়নি। এতে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। আসামীরা হচ্ছে প্রভাবশালী তারা হয়তো প্রভাবিত করছে।

নারায়ণগঞ্জ আদালতের পিপি ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, ‘এখন প্রসিকিউশন হচ্ছে হাইকোর্টের ডিজি, এজি ও অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে তারা বক্তব্য দিবেন। যেহেতু উচ্চ আদালতে কয়েকজনের সাজা কমিয়ে দেওয়ার পর বাদী পক্ষ কোন অপিল করেন নাই সেহেতু মহামান্য আদালত এখন যে কার্য বাকি আছে সেটা দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে দেন তাহলে বাদী পক্ষের কাঙ্খিত দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

গত বছরের ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন ২৬ জনের মৃত্যুদন্ড ও বাকি ৯জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করে। পরে ওই বছরের বছরের ২২ আগস্ট মঙ্গলবার আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট বেঞ্চ।

এতে সাত খুন মামলায় সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। বাকি ১১ জনের মৃত্যুদ- পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে যে ২৬ জনের মধ্যে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল নারায়ণগঞ্জের নিম্ন আদালত তাদের মধ্যে প্রধান চার আসামী সহ ১৫জনের মৃত্যুদন্ড তথা ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে হাইকোর্ট। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বাকি ১১জনকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দন্ড দেওয়া হয়েছে।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল আদালত থেকে ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুর ইসলাম সহ ৫জন এবং আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার ড্রাইভারকে অপহরণ করা হয়। এর তিনদিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়। একটি মামলার বাদী নিহত আইনজী চন্দন সরকারের মেয়ে জামাতা বিজয় কুমার পাল ও অপর বাদী নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। অপহরণের সেই ঘটনা এখনো ভুলতে পারেনি রাজধানী লগোয়া শীতলক্ষ্যার তীরের মানুষ। ঘটনার পর র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার, প্রধান আসামী নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা সহ টান টান উত্তেজনায় পার হয়ে গেছে ৪বছর।

পলাতকদের অনেকেই ইতমধ্যে আত্মসমর্পণ করেছেন। কারাদন্ড প্রাপ্তদের মধ্যে ৩ জন ও মৃত্যুদ- প্রাপ্তদের মধ্যে ৯জন ছিলেন পলাতক। মৃত্যুদ- প্রাপ্তদের মধ্যে একজন সার্জেন্ট এনামুলক কবিরকে গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারী মাগুরা থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এছাড়া গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী সৈনিক আবদুল আলীম ও গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ওয়াহিদুজ্জামান সেলিম আদালতে আত্মসমর্পন করেন। ১৭ বছরের কারাদ- প্রাপ্ত কনস্টেবল হাবিবুর রহমান হাবিবকে গত বছরের ৩১ মার্চ বরিশাল পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গত বছরের ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন নূর হোসেনের ঘনিষ্ট সহযোগী মত্যৃদ-প্রাপ্ত আসামী জামাল উদ্দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *