প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ছেলে হত্যা করে বাবা!

Slider রাজনীতি

312409_179

১৩ বছর বয়সী শিশু আউসার। তাকে হত্যা করতে একটি নাটক সাজান বাবা জাহিদ ওরফে জাহাঙ্গীর। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ছেলেকে খুন করতে ভাড়া করেন এক খুনিকে। তারপর ইয়াবার টোপ দিয়ে রাতের আধারে ধানক্ষেতে নিয়ে হত্যা করা হয় আউসারকে।

এরপর ওই রাতেই সাজান নিখোঁজ নাটক। পরের দিন লাশ পাওয়া গেলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করে জাহাঙ্গীর। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। নিজের ছেলেকে হত্যা করে অন্যকে ফাঁসাতে গিয়ে ফেঁসে গেলেন নিজেই। বাড্ডায় নিহত আউসার হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে এমন চাঞ্চল্যকর খবর।

জানা গেছে, মুরগীর দোকানে কাজ করা অবস্থায় গত ১৭ এপ্রিল মঙ্গলবার রাত দশটার দিকে পানি আনতে গিয়ে নিখোঁজ হয় আউসার। পরের দিন সন্ধ্যায় বাড্ডার পূর্ব পদরদিয়ায় একটি ধান ক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।

১৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার নিহত শিশুটির বাবা জাহিদ ওরফে জাহাঙ্গীর বাদি হয়ে কয়েকজনকে আসামি করে বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। কিন্তু পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে এ হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য। পুলিশ জানতে পায়, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই শিশুটির বাবা নিজের ছেলেকে খুন করেছে। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরিও কেনেন এই পাষন্ড পিতা। এঘটনায় নিহতের বাবাসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও।

রোববার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের ডিসি মুস্তাক আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

তিনি জানান, নিহতের বাবার সঙ্গে অটোরিকশা জমা বাবদ ৮০০ টাকা নিয়ে পার্শ্ববর্তী হেলার উদ্দিন হেলুর দ্বন্ধ ছিল। হেলারকে ঘায়েল করতে নিজের ছেলেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগী আব্দুল মজিদ। ঘটনার দিন বাজার থেকে একটি ধারালো ছুরি কিনে আনেন। পরে রাতে ছেলে আউসারকে গালে ও ঘাড়ে ধারালো চাকু দিয়ে কুপিয়ে হত্যার পর লাশ পূর্ব বাড্ডার পদরদিয়ার একটি ধানক্ষেতে ফেলে আসেন। গত বৃহস্পতিবার জাহাঙ্গীর ওই এলাকার কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে থানায় অভিযোগ দেন।

পরে পুলিশ মোবাইল ট্রাকিং করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত মজিদকে আটক করে। আটকের পর তিনি জানান, বাড্ডার আলীর মোড়ের মুরগির দোকানে কাজ করছিল আউসার। এসময় সে পানি আনতে টিউবওয়েলে গেলে সেখান থেকে তাকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। মজিদ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

হত্যামামলার তদন্তে গিয়ে পুলিশ স্থানীয়দের কাছে জানতে পারে, হেলালের স্ত্রীর সঙ্গে জাহাঙ্গীরের প্রেমের সম্পর্কও রয়েছে। এ নিয়েও দুজনের বিরোধ চলছিল। এ জন্য হেলাল মাঝে-মধ্যে জাহাঙ্গীর ও তার ছেলেকে হত্যার হুমকিও দিত। নিহতের বাবার দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি হেলালকে ঘিরে তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ একটি ভিডিও পায় ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ওই রাতে আউসার সাথে এক ব্যক্তি যাচ্ছে এবং তার কিছু দূরে পিছে পিছে লুঙ্গি পরা আরও একজনও যাচ্ছে। ভিডিওর ব্যক্তির পরনের লুঙ্গি ও জামা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তাকে থানায় ডেকে নেওয়া হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের বাড্ডা জোনের এসি আশরাফুল ইসলাম জানান, জিজ্ঞাসাবাদ করলে মজিদের সহযোগিতায় সন্তানকে হত্যার ঘটনা অকপটে স্বীকার করে জাহাঙ্গীর। পরে মজিদকেও গ্রেফতার করা হয়। মজিদ নিহতের বাবা জাহাঙ্গীরের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। সন্তানকে খুনের জন্য জাহাঙ্গীর তাকে ভাড়া করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিয়ে পুলিশ জানায়, নিহত আউসার ইয়াবা সেবন করত, এই সুযোগটা কাজে লাগাতে মজিদকে পরামর্শ দেয় জাহাঙ্গীর। সে অনুযায়ী একটি ওষুধের দোকান থেকে ইয়াবার মতো দেখতে কিছু ট্যাবলেট কেনে মজিদ। ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে মজিদ এই ট্যাবলেটকে ইয়াবা বলে কৌশলে আউসারকে তার সাথে যেতে বলে। আউসার ইয়াবা সেবনের আশায় মজিদের পেছনে পেছনে বালুর মাঠ ধানক্ষেতে যায়। তাদের পেছনে একটু দূরত্বে ছিল জাহাঙ্গীর। আউসারকে সেখানে নেওয়ার পর গলা টিপে এবং ধানক্ষেতের পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে চলে আসে মজিদ এবং অনতিদূরে দাঁড়ানো জাহাঙ্গীরকে বলে, কাজ শেষ।

জানা গেছে, ঘটনার চার-পাঁচ দিন আগেও একবার আউসারকে হত্যার পরিকল্পনা করে জাহাঙ্গীর ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে মজিদ পুলিশকে জানিয়েছে। পরদিন ধানক্ষেতে লাশ উদ্ধারের পর আশেপাশের এলাকায় হৈ চৈ পড়ে যায়। পরে জাহাঙ্গীর গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন এবং হেলালসহ কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *