
সাতদিন ধরে ‘নিখোঁজ’ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাকিবুল হাসান সরকার (৩২)। সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল ডিউটি করেন তিনি। এরপর দিন নাইট ডিউটির কথা বলে তিনি থানা ভবনের ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি।
গত সাতদিন ধরেই থানায় গড়হাজির (অনুপস্থিত) এসআই রাকিবুল গত ২৯ এপ্রিল একটি বুথ থেকে ৫ হাজার টাকাও উত্তোলন করেন। এরপর আবারও তিনি ‘নিখোঁজ’। এঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে রাকিবুলের পরিবার।
যদিও সাতদিন ধরে এসআই রাকিবুল কেন কর্মস্থলে গড়হাজির- সে রহস্য এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি পুলিশ। কর্মস্থলে গড় হাজির উল্লেখ করে থানায় একটি বিভাগীয় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
এসআই নিখোঁজ নন গড়হাজির উল্লেখ করে সোমবার (৪ মে) কলাবাগান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফজলে আশিক ঢাকা পোস্টকে বলেন, এসআই রাকিবুল হাসান গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নাইট ডিউটির কথা বলে থানা ভবনের ব্যারাক থেকে সাদাপোশাকে বের হন। পরে চা খেয়ে আবার ব্যারাকে ঢোকেন। নাইট ডিউটি আছে বলে রাত পৌনে ৮টার দিকে আবার সাদা পোশাকে ব্যারাক থেকে বের হন। এরপর আর খোঁজ নেই।
ওসি বলেন, প্রথমে বিষয়টি গরহাজির (অনুপস্থিত) হিসেবেই দেখা হয়। সেদিন রাতেই বিভাগীয় পদক্ষেপ হিসেবে একটি সাধারণ ডায়েরি নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু গত সাতদিনেও রাকিবুল ডিউটিতে যোগ দেয়নি, কর্মস্থলে আসেনি। সে সব ধরনের যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন। এসআই রাকিবুল হাসানের সন্ধানের লক্ষ্যে দেশের সব থানায় বেতারবার্তা পাঠানো হয়েছে।
থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাকিবুল হাসানের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাপতা গ্রামে। তার বাবা মাইজ উদ্দিন সরকার। রাকিবুল হাসানের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী গ্রামের বাড়িতেই থাকেন।
ওসি ফজলে আশিক আরও বলেন, রাতে ব্যারাক থেকে বের হবার সময় তার সঙ্গে ছিল মোবাইল ও চার্জার। পরিবারের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করেনি কিন্তু কেউ রাকিবুলের কোনো খোঁজ তিনি পারেননি। তারাও উদ্বিগ্ন।
সাত দিনেও তার সন্ধান না মিললেও গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার ব্যাংকের একটি বুথ থেকে ৫ হাজার টাকা উত্তোলনসহ চকবাজার এলাকায় তার উপস্থিতি প্রযুক্তিগতভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ধারণা করা হচ্ছে, অপহরণ জাতীয় কিছু নয়, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো কারণে এসআই রাকিবুল আত্মগোপনে থাকতে পারেন।
এব্যাপারে কলাবাগান থানার ওসি ফজলে আশিক বলেন, গত ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে একটি ব্যাংকের বুথ থেকে তিনি পাঁচ হাজার টাকা তোলেন। সেদিনই চকবাজার এলাকায় তার মোবাইল ফোন সক্রিয় পাওয়া যায়। কিন্তু এরপর থেকে আবারও তার সব ধরনের যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ। এখন পর্যন্ত আমরা তাকে খুঁজে বের করতে পারিনি। তাকে পেলে পুরো ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রাকিবুল আগে কাস্টমসে চাকরি করতেন। ওই চাকরি ছেড়ে তিনি পুলিশে যোগ দেন। এরপর তিনি পিবিআইতেও দায়িত্ব পালন করেন। এক মাস আগে তিনি কলাবাগান থানায় যোগ দেন।
রাকিবুল কোথায় গেছেন, পরিবারের লোকজন তা বুঝতে পারছেন না। স্ত্রীর সঙ্গে কোনো ঝামেলা ছিল না বলে জানিয়েছে পরিবার। স্বামীর সন্ধানের অপেক্ষায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীও।
মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে বাবা মাইজ উদ্দিন সরকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, মা মারা গেছে ২০১০ সালে। রাকিবরা দুই ভাই দুই বোন। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় এসআই রাকিবুল হাসানের। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। বাড়িতে সবাই উদ্বিগ্ন। বউ মা কান্নাকাটি করছে।
পুলিশে যোগদানের পর সর্বশেষ কিশোরগঞ্জের পিবিআইয়ে পোস্টিং নিয়ে গত ২৪ মার্চ ঢাকার কলাবাগান থানায় যোগদান করে রাকিবুল হাসান। নতুন স্টেশনে যোগদানের পর ব্যস্ত থাকায় এক দিনও বাড়িতে যাননি তিনি। পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হয় গত ২৭ এপ্রিল সকালে।
বাবা মাইজ উদ্দিন বলেন, গ্রামে কেউ বলতে পারবে না রাকিবুলের স্বভাব-চরিত্র খারাপ। ক্লাস ওয়ান থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হওয়া পর্যন্ত সব পরীক্ষায় ফাস্ট ক্লাস। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে। এরপর সে থিসিস করছিল। এরমধ্যেই তার একসঙ্গে ২/৩টা চাকরি হয়।
বাবা বলেন, আমি ব্যবসা করতাম। এখন পারি না। জমি-জমা দেখি। শারীরিকভাবে অসুস্থ। হেফাটাইটিস, ডায়াবেটিস এবং লিভারসিরোসিস রোগে আক্রান্ত আমি। এরমধ্যে ছেলে নিখোঁজ খবরটা নিতে পারছি না। যোগাযোগ করতেছি কিন্তু পাচ্ছি না। সাতদিন ধরে ছেলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নাই। সবাই দিশেহারা।
‘নিখোঁজ’ এসআই রাকিবুলের সন্ধান বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির রমনা বিভাগের নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শওকত আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা কাজ করছি। এখনো তাকে লোকেট করা যায়নি। চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ২৯ এপ্রিল তথ্যপ্রযুক্তিগত সহায়তায় উপস্থিতি দেখা গেলেও আবারও সব বন্ধ। এ ঘটনায় একটি জিডি হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি।
