রোহিঙ্গা শিশু ও ঘুমন্ত বিশ্ববিবেক

Slider সারাবিশ্ব

bceba695a57192910138084701335bbd-59a864d459354

 

 

 

 

 

১ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতার ছবিতে দেখা যায় টেকনাফের সাগরতীরে দুই ব্যক্তি মাথায় করে দুটি শিশুর লাশ নিয়ে ফিরছেন। কী মর্মস্পর্শী ছবি! এ ছবি দেখে বাক্‌রুদ্ধ হয়ে যাই। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মানুষ হিসেবে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

ঢেউয়ে ভেসে আসছে লাশ। রোহিঙ্গা শিশুর লাশ। আর সেই লাশ মাথায় তুলে নিয়ে আসছেন কেউ। এ যেন রোহিঙ্গা শিশুর লাশ নয়, মানবতার লাশ। দেশে দেশে মানবতা লাঞ্ছিত হচ্ছে, আর বিশ্বমোড়লেরা সেটি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন।
দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের খবর হলো, গত দুই দিনে নৌকা ডুবে ১১ শিশুসহ ৩৬ রোহিঙ্গা শরণার্থী মারা গেছে। এ ছাড়া ঘরেবাইরে, পথে কতজন নারী-পুরুষ ও শিশু হারিয়ে গেছে, তার হিসাব নেই।
টেকনাফের সৈকতের এ ছবিটি দেখে ভূমধ্যসাগরের তীরে ভেসে আসা চার বছরের আয়লানের কথা মনে পড়ে। গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়া থেকে মা-বাবার সঙ্গে আয়লানও যাচ্ছিল নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু তার আগেই নৌকাটি ডুবে গেলে আয়লান লাশ হয়ে যায়। সেই ছবি বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছিল। শরণার্থীদের জন্য ইউরোপ দরজা খুলে দিয়েছিল। আবার সেই দরজা বন্ধও হয়ে গেছে। মা-বাবা বেঁচে যাওয়ায় সিরিয়ার শিশু আয়লানের পরিচয় জানা গিয়েছিল। কিন্তু লাশ হয়ে ফেরা অনেক শিশুর পরিচয় জানা যাবে না। তারা কেবলই সংখ্যা। মিয়ানমারের ঘটনায় বিশ্বসম্প্রদায় এ পর্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ কিংবা প্রথাগত বিবৃতি দেওয়া ছাড়া কিছুই করেনি।
ছবিতে যে দুই শিশুর লাশ দেখা গেল, তাদের মা-বাবা কি ডুবন্ত নৌকা থেকে তীরে উঠতে পেরেছেন? না তাঁরাও অজ্ঞাত লাশ হয়ে সমুদ্রে ভেসে গেছেন?
মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা আজ ‘নিজ দেশে পরবাসী’। যে দেশে তারা শত শত বছর বসবাস করে আসছে, যে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তারাও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে, সেই দেশটি আজ তাদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করছে না। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এক ফরমানবলে তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করেছে।
সেই থেকে রোহিঙ্গাদের দুঃখের দিন শুরু। তারপর দেশটিতে কত পরিবর্তন হলো। সামরিক জান্তাকে হটিয়ে গণতন্ত্রের কন্যা অং সান সু চি ক্ষমতায় এলেন। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জীবন সেই তিমিরেই থেকে গেল।
পশ্চিমের যেসব দেশ মানবাধিকার নিয়ে বরাবর সোচ্চার, তাদের নিষ্ক্রিয়তা আমাদের বিস্মিত ও ব্যথিত করে। রোহিঙ্গারা কেন বারবার গণহত্যার শিকার হচ্ছে? দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে? সে দেশে তাদের ভোটাধিকার নেই। মৌলিক মানবাধিকার লুণ্ঠিত। তারপরও তারা মাটি কামড়ে ছিল। কিন্তু গত ২৬ আগস্ট পুলিশ চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার পর মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালালে তাদের আর সেখানে থাকা সম্ভব হয় না।
নিকট প্রতিবেশী হিসেবে তারা বারবার বাংলাদেশে আশ্রয়ের খোঁজে আসে। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে এ দেশে রোহিঙ্গাদের আগমন শুরু। প্রায় চার দশক। ইতিমধ্যে ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে এসেছে। তারপরও বাংলাদেশ বিমুখ করে না। বিজিবি সীমান্ত বন্ধের কথা বললেও নিরুপায় মানুষের স্রোত বন্ধ হয়ে যায় না। বাংলাদেশ মুখে যাই বলুক অতটা অমানবিক হতে পারে না। গত অক্টোবরে যখন মিয়ানমার সরকার গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তখনো প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী এখানে আশ্রয় নিয়েছিল। গত এক সপ্তাহে শরণার্থীসংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়ায় বলে বিদেশি গণমাধ্যম জানিয়েছে।
নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া তিনটি নৌকার একটিতে ছিলেন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের দংখালী গ্রামের আবদুর রহিম। চার মাস বয়সী ছেলে মো. কায়েস ও স্ত্রী জাহেদা খাতুনকে (২২) নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে বুধবার গভীর রাতে অন্যদের সঙ্গে নৌকায় ওঠেন তিনি। নৌকাটি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া সাগরতীরের কিছুটা দূরে প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় ডুবে যায়। এতে আরোহী ছিল ২৭ জন। তাদের মধ্যে পুরুষেরা সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও নারী ও শিশুদের বেশির ভাগ ডুবে মারা যায়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া সাগরসৈকতে স্ত্রী ও সন্তানকে খুঁজছিলেন আবদুর রহিম। সাগরে ভেসে ওঠা লাশ তখন জড়ো করা হচ্ছিল সৈকতের বালুচরে। আধা ঘণ্টা পর স্ত্রী-সন্তানের লাশ খুঁজে পান তিনি। গত সোমবার দংখালী গ্রামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গুলিতে মারা গেছেন রহিমের মা জমিলা খাতুন (৬৫) ও ছোট ভাই হামিদ হোসেন (১৮)। সন্তান আর স্ত্রীর জন্য একটু নিরাপদ জায়গা খুঁজতে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি।
নাফ নদীতে এ রকম কত রহিমের অশ্রু ও কান্না মিশে আছে, কত রোহিঙ্গার লাশ ভেসে এসেছে, আমাদের জানা নেই। জানা নেই, যাদের তারা নিজ দেশে রেখে এসেছে, তাদের খবরও। বিশ্ববিবেকের ঘুম ভাঙবে কবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *