প্রক্রিয়া শুরু ফের বাড়ছে বিদ্যুতের দাম

Slider অর্থ ও বাণিজ্য জাতীয়

63551_dt

 

ঢাকা; বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পাইকারি ও খুচরা গ্রাহক উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কোম্পানিগুলোর দেয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংস্থাটি। ইতিমধ্যে বিইআরসি’র কর্মকর্তারা প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই শেষ করেছেন। তবে কবে নাগাদ গণশুনানি হবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে পাইকারি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ (৭২ পয়সা)
বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। আর বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানি খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে ৮ থেকে ১২ শতাংশ হারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর আগে ২০১০ সালের ১লা মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় বছরে পাইকারি পর্যায়ে ছয়বার এবং খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদনমূল্য ৫ টাকা ৫৯ পয়সা। এর সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় যুক্ত করে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গড় দাম পড়ে ৬ টাকা ৭৩ পয়সা। কোম্পানিগুলোর দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী দাম বাড়ানো হলে প্রতি ইউনিটের গড় দাম হবে ৭ টাকা ৭১ পয়সা। বিদ্যুতের দাম ছাড়াও দু-একটি বিতরণ কোম্পানি গ্রাহক পর্যায়ে ডিমান্ড চার্জ ও সার্ভিস চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বলে সূত্র জানায়। বর্তমানে প্রতিটি মিটারে প্রতি মাসে ৩০ টাকা করে ডিমান্ড চার্জ ও ১০ টাকা করে সার্ভিস চার্জ ধার্য আছে। এটা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৪০ টাকা ও ২০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে কোনো কোনো বিতরণ কোম্পানি। দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের যৌক্তিকতা সম্পর্কে কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির (গ্যাস) দাম বাড়ানো হয়েছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে তেলও (ফার্নেস অয়েল) কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য বিক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি পড়ছে। সরকারকে এখনো বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তাই দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
অন্যদিকে যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছ থেকে সরকার-নির্ধারিত দামে ফার্নেস তেল নিচ্ছে, তাদের উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে ১২ টাকার বেশি। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি লিটার ফার্নেস তেলের দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা। আর বিপিসি বিক্রি করে ৪২ টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস তেলের দাম বাজার দর অনুযায়ী নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বর্তমান বিক্রয়মূল্যের চেয়ে কমে আসবে। তখন দাম বাড়নোর কোনো প্রশ্ন উঠবে না। কিন্তু সরকার তা না করে বিদ্যুৎ খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে রেখেছে। এতে সরকারের যে বিশেষ কোনো লাভ হচ্ছে, তা-ও নয়। কেননা, সরকার একদিকে ফার্নেস তেল বেশি দামে সরবরাহ করে মুনাফা করছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য বেশি পড়ায় ভর্তুকি দিচ্ছে। পিডিবি সূত্র বলছে, প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বেশি চালাতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি কেনায় পিডিবির ব্যয় হয়েছিল ৩৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। এ বছর তা হবে প্রায় ৪২ হাজার ৯১০ কোটি টাকা।
এদিকে গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর একদিন পর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছিলেন, গ?্যাসের দামটা একটু বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা বিদ্যুতের দামও সমন্বয় করতে চাই। তিনি বলেন, ভবিষ?্যতে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ করার লক্ষে?্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। সুতরাং আমাদের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করার মানসিকাতও থাকতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো যুক্তি তো নেই-ই, বরং দাম কমানোর সুযোগ আছে। সরকারও বলেছিল ২০১৩-১৪ সালে দাম কমানোর কথা। সেটা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তার দায়ভার গ্রাহকের ঘাড়ে চাপানো তো অনৈতিক। আগে দাম বাড়ানোর আদেশে বিইআরসির নির্দেশনা ছিল পিডিবি তথা সরকারকে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের (লিস্ট কস্ট অপশন) বিকল্প পথ অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু তা করা হয়নি বা হচ্ছে না। বেশি দামের অর্থাৎ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনই বাড়ানো হচ্ছে অপেক্ষাকৃতভাবে বেশি। আর সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস তেলের দাম বাজারদর অনুযায়ী করে দিলে উৎপাদন ব্যয় অনেকটা কমে আসতো। তা-ও করা হয়নি বা হচ্ছে না। তিনি বলেন, পদ্ধতিগত লোকসান (সিস্টেম লস) কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর কার্যক্রমও সফল হচ্ছে না।
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ এ প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে তেমন কমানো হয়নি। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম প্রতিকিলোওয়াট ২ থেকে আড়াই টাকার উপরে হওয়ার কথা নয়। হাজার হাজার টাকা লুটপাট করার জন্য দাম বাড়ানো হচ্ছে। দেশটাকে পঙ্গু করার জন্য এটা করা হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিদ্যুতের দাম কম রাখা হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ব্যাপারে পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, বর্তমানে যে দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে, তারচেয়ে পাইকারি বিক্রিমূল্য অনেক কম। গ্যাসের দাম বেড়েছে। কিছুটা সমন্বয় করা দরকার। গত অর্থবছর পিডিবির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে সরকার এ অর্থ ভর্তুকির পরিবর্তে ঋণ হিসেবে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *