বৃটেনে নতুন ধরনের করোনা দুনিয়াজুড়ে উদ্বেগ

Slider সারাবিশ্ব


নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনাভাইরাস সংক্রমণকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এতে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে দেশে দেশে। লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে টিয়ার ৪ বা সর্বোচ্চ মাত্রার লকডাউন ঘোষণা করেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মন্তব্য করেছেন। রোববার এমন ঘোষণা দেয়ারপর থেকেই বৃটিশ ফ্লাইটের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ৩০টিরও বেশি দেশ। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, সুইডেন, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও তুরস্ক। ইউরোপের বাইরের দেশ ভারত, কানাডা, ইরান, সৌদি আরব, ইসরাইল, কুয়েত এল সালভাদর, আর্জেন্টিনা, চিলি ও মরক্কো এমন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ার দেশগুলো পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজরদারি করছে।
\

তবে যুক্তরাষ্ট্র এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিশ্বের শেয়ার বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। কার্যত বৃটেন বিশ্ব থেকে বিশেষত ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকারি ঘোষণার পর বৃটিশদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহে রাখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন। রোববার মধ্যরাত পর্যন্ত বৃটেনের বিভিন্ন স্টোরে দেখা যায় তাদের দীর্ঘ লাইন। উত্তর গোলার্ধে শীতের এই সময়ে এমনিতেই শ্বাস-প্রশ্বাস সংক্রান্ত জটিলতা খুব বেশি দেখা দেয়। তার ওপর নতুন ধরনের করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইউরোপের বেশির ভাগ অংশ এরই মধ্যে লকডাউনে চলে গেছে।

বৃটেনে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে যাওয়ার কারণে বৃটেনের যাত্রীবাহী ফ্লাইটে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বিভিন্ন দেশ। এর প্রেক্ষিতে আরো সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে গতকাল আলোচনায় বসার কথা ইউরোপীয় ইউনিয়নের। লন্ডন এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ওইসব এলাকায় নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। জারি করা হয়েছে টিয়ার ৪ বা সর্বোচ্চ লকডাউন। বড়দিন উপলক্ষে যখন বিধিনিষেধ শিথিল করার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, তখন সংক্রমণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন সরকারকে। সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী জনসন ওই বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। শীর্ষ স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, এই ভাইরাস যে শতকরা ৭০ ভাগের বেশি সংক্রমিত হবে এর স্বপক্ষে প্রমাণ মিলেছে।

বৃটিশ সরকারের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রোববার থেকে বৃটেনের সকল যাত্রীবাহী ফ্লাইট আগামী ১লা জানুয়ারি পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে নেদারল্যান্ডস। দিনশেষে তারা আরো বলেছে, বৃটেন থেকে জলপথে যাওয়া সব যাত্রীর ক্ষেত্রেও তারা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে ফ্রেইট চলাচল অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, রোববার বৃটেনে নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন কমপক্ষে ১৩০০০ মানুষ। এটা একদিনে বৃটেনে আক্রান্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এ অবস্থায় বৃটেনের সঙ্গে ফ্রেইট লরিসহ সব রকম ট্র্যাভেল রোববার মধ্যরাত থেকে ৪৮ ঘণ্টার জন্য সাময়িক স্থগিত করেছে ফ্রান্স। এ দু’টি দেশের মধ্যে শত শত লরি চলাচল করে প্রতিদিন। এরই মধ্যে পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত ডোভারে ফেরি টার্মিনাল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ নিয়ে এতোই চাপ সৃষ্টি হয়েছে যে, এ ইস্যুতে সোমবার জরুরি কোবরা কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করার কথা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের।

বছরের এ সময়টাতে বিপুল পরিমাণ যাত্রী সফর করেন আয়ারল্যান্ড ও বৃটেনের মধ্যে। কিন্তু আয়ারল্যান্ড কর্তৃপক্ষ ইংল্যান্ড, ওয়েলস এবং স্কটল্যান্ড থেকে রোববার মধ্যরাত থেকে ৪৮ ঘণ্টার জন্য সব রকম যাত্রীবাহী ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে বৃটিশ জনস্বাস্থ্যের জন্য বৃটিশদের উচিত হবে না এ সময় আয়ারল্যান্ডে সফরে যাওয়া। সেটা আকাশপথে হোক বা জলপথে হোক।
জার্মানির পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, রোববার মধ্যরাত থেকে বৃটেন থেকে যাওয়া কোনো বিমানকে জার্মানিতে অবতরণ করতে দেয়া হবে না। তবে এক্ষেত্রে কার্গো হবে ব্যতিক্রম। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেনস স্পাহন বলেছেন, বৃটেনে করোনার যে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে সেই অবস্থা জার্মানিতে সৃষ্টি হয়নি। পূর্ব সতর্কতা হিসেবে রোববার মধ্যরাত থেকে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টার জন্য বৃটেন থেকে সব রকম ফ্লাইট এবং রেল যোগাযোগ স্থগিত করেছে বেলজিয়াম। ৬ই জানুয়ারি পর্যন্ত সব রকম ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে ইতালি। বৃটেন থেকে ফ্লাইট বন্ধ করছে অস্ট্রিয়াও। রোববার মধ্যরাত থেকে সব রকম ফ্লাইট সাময়িক স্থগিত করেছে বুলগেরিয়া। তুরস্ক এবং সুইজারল্যান্ডও বৃটেন থেকে অস্থায়ীভিত্তিতে সব রকম ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছে। কানাডা রোববার মধ্যরাত থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার জন্য বৃটেন থেকে যাওয়া সব যাত্রীবাহী ফ্লাইট সাময়িক স্থগিত করেছে। বৃটিশ ভ্রমণকারীদের জন্য নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে হংকং, ইসরাইল, ইরান, ক্রোয়েশিয়া, আর্জেন্টিনা, এল সালভাদর, মরক্কো, কুয়েত। অন্যদিকে করোনা মহামারির কারণে এক সপ্তাহের জন্য শুধু বৃটেন নয়, আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট বন্ধ করেছে সৌদি আরব।

নিবিড় পর্যবেক্ষণ এশিয়ায়: বৃটেনে নতুন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করোনাভাইরাস বিস্তারের প্রেক্ষিতে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজরদারি করছে এশিয়া। তবে এখনো কোনো ফ্লাইট বাতিল করার ঘোষণার খবর পাওয়া যায়নি। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ। এ অবস্থা ভারতে সবচেয়ে ভয়াবহ। তবে এশিয়ার কোনো দেশে এখন পর্যন্ত নতুন ওই ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণের খবরও পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় যে কেউ প্রবেশ করলে তাকে অবশ্যই ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। দেশটি সোমবার বলেছে, বৃটেন থেকে দক্ষিণ কোরিয়াগামী ফ্লাইটের বিষয়ে নতুন কি ব্যবস্থা নেয়া যায় তারা তা পর্যালোচনা করে দেখছে। বৃটেন থেকে সেখানে কেউ গেলে তাদেরকে কোয়ারেন্টিন থেকে মুক্ত করার আগে দু’বার করে পরীক্ষা করে দেখা হবে। গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ায় দিনে এক হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন করোনাভাইরাসে। রোববার সেখান থেকে খবর পাওয়া যায় যে, রাজধানী সিউলে একটি কারাগারের ১৮৮ জন বন্দি এবং স্টাফের মধ্যে করোনা পজেটিভ পাওয়া গেছে। দেশটির হাসপাতালগুলোতে বেডের সংকট দেখা দিয়েছে। সোমবার বলা হয়েছে, এ সপ্তাহের শেষের দিকে এক স্থানে চার জনের বেশি মানুষ জমায়েত নিষিদ্ধ করা হতে পারে। বছর শেষে সেখানে করোনাভাইরাসে জটিল আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালে বেড দ্বিগুণ করার প্রয়োজন হতে পারে।

ওদিকে তাইওয়ানেও ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন নিয়ম কার্যকর আছে। তারা রোববার বলেছে, বৃটেন থেকে যাওয়া কোনো ফ্লাইট বন্ধ করার পরিকল্পনা এখনো তারা নেয়নি। অন্যদিকে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে ভারত সরকারের একটি কমিটি। নতুন ধরনের করোনার বৈশিষ্ট্য নিয়ে সোমবার ওই কমিটির বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে যদি ভ্রমণের ৭২ ঘণ্টা আগে করোনা নেগেটিভ সনদ থাকে তাহলে তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখার বাধ্যবাধকতা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের পরেই আক্রান্তের দিক দিয়ে ভারত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
জাপান তো নীতিগতভাবে এরই মধ্যে বৃটেন থেকে ফ্লাইট তার দেশে নিষিদ্ধ করেছে। তবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তারাও পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছে। নতুন ধরনের করোনাভাইরাস কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে সেদিকে দৃষ্টি রেখেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *