হঠাৎ গরিব

Slider জাতীয় বিচিত্র

ছোট ব্যবসা। মাঝারি চাকরি। তা দিয়েই জীবনটাকে সাজিয়েছিলেন। গুছিয়ে এনেছিলেন কিছুটা। সংগ্রাম ছিল, ছিল দিন বদলের স্বপ্নও। কিন্তু হঠাৎ পাল্টে গেল সব। সামনে ঘোর অন্ধকার। এমন দিন আসবে ভাবতেও পারেননি কেউ।

কালান্তক করোনা যে শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে তাই নয়, জীবিকাকেও রেয়াত করছে না। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ তাদের আয় হারিয়ে ফেলেন লকডাউনের শুরুতেই। যদিও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমিত আকারে অর্থনৈতিক কর্মকা- শুরু হওয়ার পর তারা কিছুটা আয় ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশের জীবনের চাকা যেন আর চলছেই না। বেশিরভাগ ব্যবসাপাতি বন্ধ। চাকরিতে কোথাও বিলম্বে বেতন , কোথাও আটকে আছে। আবার কারও কারও বেতনে পড়েছে করোনার কোপ। এই অবস্থায় যেন হঠাৎ গরীব হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। অনেকে অবশ্য এ কাতারে নাম লিখিয়েছেন ইতিমধ্যে।

মোটাদাগে এ চিত্র অবশ্য সারা দুনিয়াতেই। মৃত্যুর মিছিলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্বের মিছিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও বলছে, বিশ্বে যত লোক কাজ করেন করোনা ভাইরাস মহামারিতে তাদের অর্ধেক বেকার হয়ে পড়বেন। আর সবচেয়ে শোচনীয় প্রভাব পড়বে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর। বাংলাদেশে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের জরিপ বলছে, করোনায় ইতিমধ্যে মধ্যবিত্তের আয় কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্স সেন্টার (পিপিআরসি) এক জরিপে বলছে, শতকরা ৭০ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিছিন্ন হয়ে গেছেন ৭১ শতাংশ মানুষ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের চার কোটি পরিবার আছে। এর মধ্যে নিম্নবিত্ত ২০ ভাগ আর উচ্চবিত্ত ২০ ভাগ। মাঝের যে ৬০ ভাগ এরা নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত। এই সংখ্যা আড়াই কোটি পরিবার হবে। এর মধ্যে সরকারি চাকুরিজীবী, মাল্টিন্যাশনাল ও বড় কোম্পানিতে কাজ করা কিছু মানুষ বাদে অন্যরা সবাই সংকটে আছেন। এদের মধ্যে বড় একটা অংশ চাকরি ঝুঁকিতে আছেন। অনেকেরই বেতন হয়নি, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ফলে তারা বেতন তো পাননি, উল্টো চাকুরি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন।

এই যখন অবস্থা তখন বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন আর জীবিকা। মিরপুর ২ নম্বরে মোল্লাপাড়া এলাকায় ফুচকার দোকান চালাতেন রাজীব ইসলাম ও তার স্ত্রী। বাড়িতে বৃদ্ধ মা ও ২ সন্তান। ভ্যানের এই ফুসকার দোকানটাই পরিবারটির একমাত্র ভরসা। কিন্তু বন্ধ সব। বন্ধ ফুচকার দোকান। মাথার ওপর বাড়ি ভাড়ার চাপ। নেই খাবারের কোন সন্ধান। দিনভর সাহায্যের আশায় ছুটে বেড়ান শহরে। রাজিব জানান, একদিন ফুচকার দোকান খুলেছিলেন। ক্রেতাশুন্য। আবার পুলিশ এসে উঠিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে আর দোকান খুলেননি। তিনি বলেন, আমার এই দোকানটাই সম্বল। বাড়িত খাওয়ার মতো কিছু নাই। এখন সাহায্যের আশায় থাকি। সাহায্য না পাইলে চুরি করা লাগবে।

সবে একটু গুছিয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন সাজু ইসলাম। দরিদ্র পরিবারের ছেলে সাজু। বাড়ি নীলফামারীর সীমান্তবর্তী এলাকায়। বাবা মারা গেছেন বছর আড়াই হলো। মৃত্যুর আগে চিকিৎসার পিছনে খরচ হয়েছে ঢের। চার ভাই-বোনের বড় তিনি। একমাত্র বোনের বিয়েতেও খরচ করতে হয়েছে অনেক। বিয়ে ও বাবার চিকিৎসা করাতে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন পারিবারিক সুত্রে পাওয়া আবাদী জমি। ছোট দুই ভাই স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী। পরিবারের হাল ধরতে সাজু চলে আসেন রাজধানীতে। পেয়ে যান নির্মাণ শ্রমিকের কাজ। ভালোই চলছিলো। বাড়িতে একটা গরুও কিনেছেন। এরই মাঝে মেয়ের বাবা হয়েছেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ নেমে এলো অন্ধকার। কাজ নেই। বাড়িতে বসে আছেন। সঞ্চয়ের টাকায় চলছে দিন। হঠাৎ কর্ম হারানো সাজু জানান, হাতে যা টাকা আছে তা দিয়ে সেদ্ধ ভাত খেয়ে বেঁচে থাকলেও সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ যাবে। বলেন, মেলা কষ্ট করি গরুটা কিনছিলাম। ছাওয়ালটা গরুটার দুধ খায়। তিনি বলেন, কোনদিন হয়তো গরুটাক বিকি দেয়া লাগে।

কুড়িগ্রামের উলিপুরের বাসিন্দা নবাব আলী। ২০১৯ সালের বন্যায় তার মুরগীর খামারে পানি উঠে যায়। মাত্র ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে মুরগী বিক্রি করেতে বাধ্য হন। পড়েন লোকসানের মুখে। পানি নেমে যায়, সুদের টাকায় ঋণ নিয়ে আবার সেই খামারটি ধরে বাঁচতে শুরু করেন। বলেন, বানের সময় লস হইছিলো আড়াই লাখ টাকা। এরপর সুদে ঋণ নিয়ে আবার শুরু করি পোল্ট্রি ব্যবসা। কিন্তু কর্মহীন মানুষের হাতে টাকা নাই। ভাত পায়না মুরগী কিনবে কোথ থেকে? মুরগী গুলোর বয়স হয়ে যাচ্ছে। মারা যাবার ভয়ে অর্ধেক দামে বিক্রি করছি। তাও মানুষ কিনছে না। ঋনের টাকা শোধ না হতেই আবার ধাক্কা খাইলাম।

দীর্ঘ অর্ধযুগ সিঙ্গাপুরে ছিলেন এরশাদ আলী। দারিদ্রতার ছোবলে কলেজের গণ্ডি পেরুনো হয়নি তার। বিদেশে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করে ফেরেন দেশে। কাজ করতেন ফাস্টফুডের দোকানে। দেশে ফিরে বসেন বিয়ের পীড়িতে। সব আয় দিয়ে খোলেন মায়ের দোয়া কফিশপ, পঞ্চগড় শহরে। জমানো সব টাকার পাশাপাশি ফাস্ট ফুডের দোকানের পিছনে করতে হয়েছে ঋণ। দোকানটা চলতো বেশ। কিন্তু হঠাৎ স্বপ্ন ভঙ্গ। হয়ে পড়েছেন বেকার। সীমিত আকারে দোকান খোলা রাখলেও বিক্রি কমে গিয়েছে চারভাগের একভাগে। বলেন, এই বিক্রি দিয়ে দোকান ভাড়া আর কর্মচারীরর বেতনটাও উঠে না। তার উপরে ঋণের বোঝা।

কোনরকম টিউশনি করে চলতো ফয়সাল হোসেনের জীবন। ফরিদপুরের এই শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রাজধানীর তিতুমীর কলেজে। টিউশনি করিয়ে জুটতো দু’মুঠো ডাল-ভাত, লেখাপাড়া আর থাকার খরচ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। বন্ধ টিউশনি। বাড়িতে আছেন বাধ্য হয়ে। বলেন, বাবা চাকরী করতেন প্রাইমারী স্কুলে। বাবা-মা দু’জনই অসুস্থ। প্রতিমাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। পেনশনের টাকা ও অল্প কিছু জমি দিয়ে চলছিলো সংসার। অভাব অনটন লেগেই রয়েছে। এরই মাঝে আমি বেকার হয়ে বাড়িতে বসে আছি। করবার মতো কিছুই পাচ্ছিনা। বাড়ির মুরগী বিক্রি করে দুদিন আগে বাজার করেছি। এমনি অবস্থা করোনার এ সময়ে কেউ টাকা ধার পর্যন্ত দিচ্ছেন না।

ভালো নেই প্রবাসীরাও। তেমন ভালো নেই দেশে থাকা প্রবাসীদের স্বজনরাও। রাজধানীর বকশিবাজারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে থাকেন এক মা। বড় ছেলে সরকারি চাকরি জোটাতে দিন-রাত এক করে পড়াশুনা করছেন। এক মেয়ে অনার্সে ও আরেকজন পড়েন অষ্টম শ্রেণীতে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েটি বলেন, বাবা থাকেন দক্ষিন আফ্রিকায়। জোহানেসবার্গে একটি নির্মাণ সামগ্রীর দোকান আছে। চারজন বাংলাদেশির মালিকানায় পরিচালিত। ছোট এই দোকানটি ঘিরেই আমাদের সংসার। কিন্তু করোনা আসার পর থেকে আয়হীন বাবা। এপ্রিল মাসে অল্প কিছু টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর চলতি মাসে কোন টাকা পাঠাতে পারেননি। বাসা ভাড়া বাকী। দিনকে দিন হতাশ হয়ে যাচ্ছি। সঞ্চয়ের টাকায় চলছি। প্রতিমাসে বাড়িভাড়া ও খাওয়া খরচের পিছনে চলে যায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। বাবাই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমাদের পরিবারে। যত দিন যাচ্ছে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এভাবে চললে অচিরেই সম্পত্তি বিক্রি কিংবা না খেয়ে থাকতে হবে আমাদের।

ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন উদ্যোক্তা হবেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে তানিয়া ইসলাম। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সহপাঠীকে। স্বামীর চাকরি ও নিজের অনলাইন ব্যবসায় ভালোই চলছিলো দিন। ফেসবুক পেইজের মাধ্যমেই চলে তার ব্যবসা। পহেলা বৈশাখ ও ঈদ উপলক্ষে প্রায় লাখখানেক টাকার মালামাল কিনেছিলেন। কিন্তু করোনায় গুড়েবালি। পহেলা বৈশাখে কোন কিছুই বিক্রি হয়নি বললেই চলে। ঈদ উপলক্ষে অল্প কিছু অর্ডার মিলছে। তিনি বলেন, বৈশাখ উপলক্ষ্যে যেসব পণ্য কিনেছি এগুলো সাধারণত অন্যান্য সময় বিক্রি হয়না। এখন এই পণ্যগুলো আমাকে এবছর রেখে দিতে হবে। লকডাউনের কারণে অনলাইনে অর্ডারের পরিমাণ বেশ বেড়েছে কিন্তু স্বাভাবিক সময়ের থেকে কম। আমার হাতে টাকা না থাকায় কিনতে পারছিনা পণ্য আর ব্যবসাটাও করতে পারছি না।

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে চাকরীর পিছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হয়েছেন রাকিব হাসান। রাজধানীর বসিলা এলাকায় গড়ে তুলেছেন গরুর খামার। তার খামারের দুধের ক্রেতা গোটা রাজধানী জুড়ে। কিন্তু করোনার প্রভাবে বিপাকে পড়েছেন তিনি। রাকিব হাসান বলেন, যাদের বাসায় নিয়মিত দুধ যেতো তারা প্রায় ৩০ শতাংশ গ্রাহকই ঢাকায় নেই। আর ৫০ শতাংশ গ্রাহক ঢাকাতে থাকলেও এখন তারা আরা অর্ডার দিচ্ছেন না। এমনই অবস্থা দাঁড়িয়েছে নিজের খাবারের থেকেও গরু গুলোকে সুস্থ রাখা, খাবার দেয়া দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একেতো আয় কমেছে আবার করোনার এ পরিস্থিতিতে গো খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়ভাবে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করছি দুধ। কারণ দীর্ঘ দিন ফ্রিজিং করবার মতো প্রযুক্তি নেই আমার।

একই সঙ্গে চিন্তায় পড়েছেন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজা করণের খামারিরাও। আকাশ আল হাসান, বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের বড় একটা আয়ের উৎস কোরবানির গরু। আমরা গরু কিনে ৮ থেকে ৯ মাস পালন করি। এরপর কোরবানির জন্য বিক্রি করি। এবার গরু কেনার পরপরই করোনা আসে। আমার পরিবারের প্রায় ১০ লাখ টাকা ইনভেস্ট করা হয়েছে এবছর। এভাবে চলতে থাকলে অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। মানুষের হাতে টাকা থাকবে না কোরবানি করবার মতো। সেইসঙ্গে দরিদ্র মানুষ স্বল্প দামে বিক্রি করে দেবেন গরু। একটা লোকসানের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আর গরু যদি ঈদে বিক্রি না হয় আরো এক বছর পালতে হয়, সেটা হবে আরো বড় লোকসান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *