বঙ্গতাজ পরিবারের তিন মন্ত্রীর পদত্যাগ, ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের আত্মহত্যা!

Slider টপ নিউজ সম্পাদকীয়

লাল সবুজের পতাকায় আবৃত একটি দেশের নাম বাংলাদেশ। ৯ মাস যুদ্ধ করে রক্ত আর ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন দেশটির নাম হল বাংলাদেশ। মহান ‍মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। এই দলের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে স্বশস্ত্র সংগ্রাম করে আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে কারাগারে নির্মমভাব খুন হওয়া চার জাতীয় নেতা অন্যতম। চার জনের একজন, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। জাতি বঙ্গবন্ধু হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গতাজ হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ই। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ দুটি উপাধী হিসেবে পাশাপাশি অবস্থান করছে। এই দুটি পরিবারের যারা সদস্য তারাও কম সংগ্রামী ও দেশপ্রেমিক নয়। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মীনি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলার কাজ করেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দিয়ে চালাতেন। আর বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মীনি সৈয়দা জহুরা তাজউদ্দীন তার স্বামীর সঙ্গে সব কাজে জড়িত ছিলেন এবং বিপদের সময় দেশ স্বাধীনকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রধানের দায়িত্ব পালনও করেন। ফলে মহান মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দুটি পরিবার অঙ্গাআঙ্গি ভাবে
জড়িত।

ইতিহাস বলছে, বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ একবার মন্ত্রীত্ব ছেড়েছেন। পরবর্তি সময় বঙ্গতাজের ভাই এডভোকেট আফছার উদ্দিন খানও মন্ত্রীত্ব ছেড়েছেন। শেষে মন্ত্রীত্ব ছাড়লেন বঙ্গতাজের ছেলে সোহেল তাজ। বঙ্গতাজ পরিবারের তিন মন্ত্রীর সকলেই নির্ধারিত মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করেন। আফছার উদ্দিন খান ও সোহেল তাজ ছয় মাসের মত মন্ত্রীত্ব করেছেন। তারপর তারাও মন্ত্রীত্ব ছাড়েন। বাংলাদেশের ইতিহাসখ্যাত বঙ্গতাজ পরিবারের তিন মন্ত্রীর সকলেই পদত্যাগ করেছেন, এটা আমাদের জন্য লজ্জার। তাদের পদত্যাগের নেপথ্যের কাহিনী স্পষ্ট না হলেও জাতিকে ব্যাথিত করে, এটা সঠিক। পদত্যাগের কারণ যাই হউক, এটা পরিস্কার যে, নীতি ও আদর্শের কাছে পরাজিত না হয়ে নীতির প্রশ্নে তিন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এটা সঠিক।

এদিকে বঙ্গতাজের সহধর্মীনি সৈয়দা জহুরা তাজউদ্দীন কোনদিন এমপি বা মন্ত্রী হতে পারেননি। অনেক টেকনোক্রেট মন্ত্রী হয়েছেন আমাদের সরকারে। কিন্তু জহুরা তাজউদ্দীন কোনদিন গাড়িতে জাতীয় পতাকা পাননি। বলতে হবে আমরা দেই নি। কারণ বাংলাদেশ সরকারে একাধিক যুদ্ধাপরাধী মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল ও সেই দলের এক সময়ের প্রধান, একই সাথে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মীনি হয়েও বেগম জহুরা তাজউদ্দীন জাতীয় পতাকা পাননি। কিন্তু তিনি জাতীয় পতাকা পেয়েছেন, রাষ্ট্রীয় সালাম পেয়েছেন, জাতীয় পতাকা মোড়ানো কফিনে রাষ্ট্র গার্ড অব অনার দিয়েছে, তবে সেটা মহিয়সী এই রমনীর মৃত্যুর পর। জীবদ্দশায় তিনি জাতীয় পতাকাবাহী গাড়ি পাননি। এমপি প্রার্থী হয়েও পরাজিত হয়েছেন তিনি।

বঙ্গতাজ পরিবারের তিন মন্ত্রীর মেয়াদের আগেই পদত্যাগ ও বঙ্গতাজের স্ত্রীর মৃত্যুর পর জাতীয় পতাকার সম্মান পাওয়া, প্রমান করে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বঙ্গতাজ পরিবারের অবদান আমরা পুরোপুরি স্বীকার করতে কৃপনতাই শুধু করিনি, বরং একটি অধ্যায়ের অপমৃত্যু ঘটিয়েছি।

অতি-সম্প্রতি সোহেল তাজের বোন গাজীপুর-৪(কাপাসিয়া) আসনের এমপি সিমিন হোসেন রিমিকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়েছেন আওয়ামীলীগেরই এক নেতা। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজের দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কি ভাবে বঙ্গতাজের মেয়ে ও বর্তমান এমপি সিমিন হোসেন রিমিকে তার ও তার বাবার নির্বাচনী এলাকায় হত্যার হুমকি দেয়া হয়, তা জাতির বোধগম্য নয়। এটা অত্যন্ত নিন্দা ও পরিতাপের বিষয়।

ইদানিং সোহেল তাজ তার ফেইসবুক পেজে বিভিন্ন সময় ষ্ট্যাটাস দেন। তার ষ্ট্যাটাসগুলো হয়ে যায় গণমাধ্যমের খবর। কয়েক দিন আগে সোহেল তাজের একটি ষ্ট্যাটাস নিয়ে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও মন্তব্য করেছেন। এটা নিয়ে তোলপাড় এখনো চলছে।

জাতি আশা করে, মহান মুক্তিযুদ্ধের অবদান ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ পরিবারকে যথাযথ সম্মান দেয়া উচিত। কোথাও ব্যতয় ঘটলে ইতিহাসেরও যেমন ক্ষতি হবে তেমনি দেশেরও ক্ষতি হবে না, এমনটিও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কারণ বাঙালী বীরের জাতি। বাঙালী সত্য স্বীকার করতে জানে। স্বাধীনতার জন্য জীবন-যৌবন সব বিসর্জন দিতে পারে এটা প্রমানিত।

ড. এ কে এম রিপন আনসারী
সাংবাদিক ও মানবাধীকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *