বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ বেড়েছে, সভা সমাবেশের অধিকার সীমিত

Slider জাতীয় সারাবিশ্ব

 

106136_f6
ঢাকা: উদ্বেগজনকভাবে বাংলাদেশে বিচার বিভাগে সরকারের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাইয়ে প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা হয়। ওই সংশোধনীতে বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও  অযোগ্যতার অভিযোগ আনা হলে পার্লামেন্টকে অভিশংসনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি ওই সংশোধনী বাতিল করে দেয়ার পর তার সমালোচনা হয় সরকারের পক্ষ থেকে । এরই পরিপ্রেক্ষিতে নভেম্বরে প্রধান বিচারপতির পদ ত্যাগ করেন এস কে সিনহা। এর ফলে দেশ এমন একটি পরিস্থিতিতে ধাবিত হয়, যাতে ইঙ্গিত মেলে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে সাংবাদিকরা অব্যাহতভাবে হামলার মুখে। সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের টার্গেট ও হয়রান করতে নিষেপষণমূলক আইনের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে সরকার। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা হয়েছে। অব্যাহত রয়েছে জোরপূর্বক গুম। বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা : অ্যামনেস্টি’র প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা রোধ করতে নিষেপষণমূলক আইনের ব্যবহার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বান উপেক্ষা করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) শাস্তিমূলক ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রবর্তন করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে, অনলাইনে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আরো সীমাবদ্ধ করে দেয়া হবে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে সশস্ত্র বাহিনী আনসার আল-ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীদের হত্যা করেছে। দলটির বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। দলটিকে গত বছরের মার্চ মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অপরাধীদের বিচারকার্যে দেরি হওয়ায় বেসামরিক সমাজে এখনো তাদের প্রভাব বিদ্যমান।
সমকামী, তৃতীয় লিঙ্গ ও উভলিঙ্গের মানুষদের অধিকার : এলজিবিটি (সমকামী বিষয়ক) কর্মীরা প্রতিনিয়ত মানহানি ও রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র-বহির্ভূত পৃষ্ঠপোষকতায় বিচারবহির্ভূত বন্দিদশার শিকার হয়েছেন। ২০১৬ সালে কয়েকজন কর্মী আনসার আল-ইসলামের হাতে খুন হওয়ার পর এলজিবিটিআই সমপ্রদায়ের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কর্মী আত্মগোপনে আছেন। এলজিবিটিআই কর্মী জুলহাস মান্নান, মাহবুব রাব্বি তনয়, অভিজিৎ রায়, নিলাদ্রী নিলয়ের হত্যার আসামিদের বিচার করা হয়নি। যদিও ২০১৭ সালে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
সমাবেশ করার অধিকার : শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার স্বাধীনতার অধিকার তীব্রভাবে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রচারণা বিষয়ক বৈঠক ও রাজনৈতিক সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। ফরেইন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্টের অধীনে বিভিন্ন এনজিও’র কর্মীদের কার্যক্রম সীমিত করে দেয়া হয়েছে।
জোরপূর্বক গুম : নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে নিয়মিতভাবে জোরপূর্বক গুম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এক্ষেত্রে, প্রধানত বিরোধীদলীয় সমর্থকদের টার্গেট করা হয়েছে। গুম হওয়া অনেককে পরবর্তীতে মৃত হিসেবে পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারিতে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জাতিসংঘের জোরপূর্বক বা অনিচ্ছাকৃত অন্তর্ধান বিষয়ক সংস্থা বলেছে, সামপ্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর ৮০ জনের অধিক ব্যক্তি গুম হয়েছেন।
মার্চ মাসে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র এক সাবেক নেতার ছেলে হাম্মাম কাদের চৌধুরীকে ছয়মাস বাইরের জগৎ থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বন্দি রাখার পর মুক্তি দেয়া হয়। তার বাবাকে আগেই ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। এরকম আরো দুই নেতার সন্তান আহমেদ বিন কাসেম ও আব্দুল্লাহিল আমান আজমি’কে নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে নিখোঁজ হন।
বিচার বিভাগ : বিচার বিভাগে সরকারের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ নিয়েও প্রতিবেদনটিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে প্রধান বিচারপতি একটি বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীর (ষোড়শ সংশোধনী) বাতিল করে দেন। ওই সংশোধনী অনুসারে,  বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অযোগ্যতার অভিযোগ আনা হলে পার্লামেন্টকে অভিশংসনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। সংশোধনী বাতিলের পর প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করে সরকারি দল। পরবর্তীতে নভেম্বরে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেন ও দেশ ত্যাগ করেন।
শরণার্থী ও আশ্রয় প্রার্থী : গত আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন অঙ্গরাজ্যে সহিংসতা শুরু হলে সেখান থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ৬ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানের নামে চালানো নৃশংসতা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আশ্রয় নেন। আগে থেকেই কক্সবাজারে বিশাল সংখ্যার রোহিঙ্গা অবস্থান করছিল। আন্তর্জাতিক নিয়মের অধীনে রাখাইনে সেনাবাহিনীর জাতি নিধন মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য।
বাংলাদেশ পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা গুরুতর অপুষ্টিতে ভোগার খবর প্রকাশ হয়েছে। নতুন আগত রোহিঙ্গাদের ৬০ শতাংশের বেশি শিশু। তারাও অপুষ্টিতে ভুগছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মেয়ে ও নারীরা যৌন হামলা, মানবপাচারের শিকার হওয়ার তীব্র ঝুঁকিতে আছে। অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপর্যাপ্ত সুরক্ষা-ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত শিবির ব্যবস্থাপনা কৌশল, বেসামরিক প্রশাসনের অভাব, আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থা সহ অন্যান্য সেবার অভাবে ভুগেছে রোহিঙ্গারা। নভেম্বরে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ক একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনের সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্যাতন ও অন্যান্য অসদাচরণ : বন্দিদের ওপর ব্যাপক হারে নির্যাতন ও অন্যান্য অসদাচরণ করার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ক অভিযোগগুলো নিয়ে কদাচিৎ তদন্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ইচ্ছা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সচেতনতার অভাবে ২০১৩ সালে প্রণীত নির্যাতন ও বন্দি অবস্থায় মৃত্যু বিষয়ক আইনের ব্যবহার অপর্যাপ্ত ছিল।
মৃত্যুদণ্ড : অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরে বেশ সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এপ্রিলে দুই জনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসঙ্গত, ট্রাইব্যুনালটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা তদন্তের জন্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ট্রাইব্যুনালটির বিচারকার্যে নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যেমন, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মামলা প্রস্তুত করতে পর্যাপ্ত সময় না দেয়া ও সাক্ষীর সংখ্যা সীমিত করে দেয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *